জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সরকার পতন – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে সরকার পতন – বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দিয়ে শুরু হলেও, পরবর্তী সময়ে সংঘাত, প্রাণহানি, দমন-পীড়ন, দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং এক দফা দাবির মধ্য দিয়ে আন্দোলনটি একটি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি ছাত্র আন্দোলন ছিল না; বরং এটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

আন্দোলনের পটভূমি

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ বিভিন্ন ধরনের কোটা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু ছিল। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলনের মুখে সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তবে ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্টের একটি রায়ে ২০১৮ সালের সেই সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর ফলে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ পূর্বের কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের পথ তৈরি হয়।

হাইকোর্টের এই রায় প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তাদের অভিযোগ ছিল, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থার পরিবর্তে কোটা পুনর্বহাল হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হবেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা

হাইকোর্টের রায়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হতে শুরু করেন।

আন্দোলনের নেতৃত্বে আসে “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” নামে একটি প্ল্যাটফর্ম। শুরু থেকেই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল হাইকোর্টের রায় বাতিল করে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা এবং সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা।

প্রথমদিকে আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ এবং স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।

‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি

দাবি আদায়ে আন্দোলনকারীরা জুলাই মাসের শুরুতে “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকার শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, সায়েন্সল্যাব, কাকরাইল, মহাখালী, উত্তরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করা হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও শিক্ষার্থীরা সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেন।

অবরোধের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, দাবি আদায়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই তারা এই অবরোধ পালন করছেন।

আন্দোলনের বিস্তার

প্রথমে আন্দোলন শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও অল্প সময়ের মধ্যেই সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা এতে যুক্ত হন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ছবি, ভিডিও ও বিভিন্ন বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেশের বাইরে অবস্থানরত অনেক বাংলাদেশিও আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।

আন্দোলন যত বিস্তৃত হতে থাকে, ততই সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের আহ্বান, আইনগত প্রক্রিয়ার অপেক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানানোর আহ্বান জানানো হয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাদের যৌক্তিক দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

উত্তেজনা বাড়তে শুরু

জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবর প্রকাশ হতে থাকে।

ক্যাম্পাস ও সড়কে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং আহত হওয়ার ঘটনা বাড়তে থাকে। এর ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সারাদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।

একই সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে অনেক শিক্ষার্থী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হওয়া

জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আন্দোলন আর শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিদিনের সংঘর্ষ, আহত ও নিহতের খবর, প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কারণে বিষয়টি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার কথা জানায় এবং সহিংসতা এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়।

এই পর্যায়ে আন্দোলন একটি নতুন মোড় নিতে শুরু করে, যা পরবর্তী কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহে বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়।


১৪-২০ জুলাই: সংঘর্ষ, প্রাণহানি, আবু সাঈদের মৃত্যু, কারফিউ ও দেশব্যাপী অস্থিরতা

জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন আরও তীব্র হতে থাকে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকলেও ১৪ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শত শত শিক্ষার্থী আহত হন এবং আন্দোলন নতুন মোড় নেয়।

১৪ জুলাই: উত্তেজনার নতুন অধ্যায়

১৪ জুলাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। আন্দোলনের দাবিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা তীব্র হয়ে ওঠে। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলন নিয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চলতে থাকে এবং দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মসূচি ঘোষণা করতে থাকেন।

আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। অন্যদিকে সরকার আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করার আহ্বান জানায়।

১৫ জুলাই: সংঘর্ষে উত্তপ্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ এবং লাঠিসোঁটার ব্যবহারে বহু শিক্ষার্থী আহত হন।

একই সময়ে দেশের আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তোলে।

এই সংঘর্ষের পর আন্দোলনের ব্যাপ্তি আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরদিন থেকে আরও কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

১৬ জুলাই: আবু সাঈদের মৃত্যু এবং আন্দোলনের মোড় পরিবর্তন

১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর ঘটনাটি আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এই দৃশ্য দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

আবু সাঈদের মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক মিছিল, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকারীরা নিহতদের বিচার এবং দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানান।

দেশজুড়ে সংঘর্ষ ও প্রাণহানি

১৬ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে থাকে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, কুমিল্লা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

বিভিন্ন স্থানে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড তৈরি করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ করেন।

সংঘর্ষে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ বহু মানুষ আহত হন। পরবর্তী কয়েক দিনে নিহতের সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।

১৭ জুলাই: ক্যাম্পাস বন্ধ ঘোষণা

পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় দেশের অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে অনেক শিক্ষার্থী হল ত্যাগ না করে আন্দোলনে অংশ নিতে থাকেন।

আন্দোলনের অন্যতম সংগঠকেরা ঘোষণা দেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে আন্দোলন দমন করা যাবে না এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।

১৮ জুলাই: সহিংসতার বিস্তার

১৮ জুলাই আন্দোলন আরও সহিংস রূপ নেয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, অবকাঠামো এবং গণপরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন জেলায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

এই সময় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়।

মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ

১৮ জুলাই সন্ধ্যার দিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তীতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাও ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

দীর্ঘ সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় দেশের ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বাংলাদেশ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহে সমস্যার কথা জানায়।

১৯ জুলাই: কারফিউ জারি

পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় ১৯ জুলাই সরকার সারাদেশে কারফিউ জারি করে।

কারফিউ কার্যকর করতে মাঠে নামানো হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করে।

জরুরি প্রয়োজন ছাড়া সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে সেনা টহল শুরু হয় এবং প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।

২০ জুলাই: উত্তেজনা অব্যাহত

কারফিউ জারির পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়।

বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে বহু আন্দোলনকারী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিককে আটক করা হয় বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এই সময় নিহত ও আহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর, দেশীয় মানবাধিকার সংগঠন এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পৃথক মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়।

আন্দোলনের নতুন মোড়

২০ জুলাইয়ের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নতুন দিকে মোড় নিতে শুরু করে। আন্দোলনকারীরা শুধু কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেন।

অন্যদিকে সরকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে যায় এবং আদালতের রায়ের অপেক্ষা করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে।

জুলাইয়ের এই কয়েক দিনের সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং কারফিউ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম অস্থির সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলন পরবর্তী পর্যায়ে আরও বড় রাজনৈতিক রূপ লাভ করে, যা শেষ পর্যন্ত আগস্ট মাসের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তি তৈরি করে।

 


আপিল বিভাগের রায়, আন্দোলনের নতুন মোড়, এক দফা দাবি ও অসহযোগ আন্দোলন

জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে দেশজুড়ে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও কারফিউর মধ্যেই কোটা ব্যবস্থা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে চলতে থাকে। আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থা সংস্কার। তবে ধারাবাহিক সহিংসতা, হতাহতের ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পর আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে।

২১ জুলাই: আপিল বিভাগের রায়

২০২৪ সালের ২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত দেন।

রায় অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে অধিকাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নির্দেশনা বহাল রাখা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য সীমিত পরিমাণ কোটা রাখার কথা বলা হয়। আদালতের এই রায়ের পর সরকার তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের মূল দাবি আদালতের রায়ের মাধ্যমে কার্যত নিষ্পত্তি হয়েছে। তাই সবাইকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়।

আন্দোলনকারীদের অবস্থান

আদালতের রায়ের পরও আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেননি।

তাদের দাবি ছিল, আন্দোলন চলাকালে যারা নিহত ও আহত হয়েছেন, তাদের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা, আটক ব্যক্তিদের মুক্তি এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রত্যাহার করতে হবে।

এই সময় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে কোটা সংস্কার থেকে সরে গিয়ে প্রাণহানি, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করে।

কারফিউ শিথিল, কিন্তু উত্তেজনা অব্যাহত

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সরকার ধাপে ধাপে কারফিউ শিথিল করতে শুরু করে।

সীমিত পরিসরে সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক এবং কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। ইন্টারনেট সেবাও পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক হতে থাকে।

তবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের বিভিন্ন ভিডিও, ছবি ও বক্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি

জুলাইয়ের শেষ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

তারা দেশব্যাপী বিক্ষোভ, গণমিছিল, শোক সমাবেশ এবং নাগরিক সংহতি কর্মসূচি পালন করেন। একই সঙ্গে নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দোয়া, শোকসভা ও মোমবাতি প্রজ্বলনের আয়োজন করা হয়।

আন্দোলনের প্রতি বিভিন্ন পেশাজীবী, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী এবং সাধারণ নাগরিকের সমর্থন বাড়তে থাকে।

এক দফা দাবির ঘোষণা

আগস্ট মাসের শুরুতে আন্দোলনের মোড় আবারও পরিবর্তিত হয়।

সমন্বয়কেরা ঘোষণা দেন যে, পূর্বের বিভিন্ন দাবির পরিবর্তে এখন আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হবে এক দফা দাবি বাস্তবায়ন।

এই এক দফা দাবির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং সরকারের পরিবর্তন।

এর মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়।

অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা

এক দফা দাবির পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশব্যাপী অসহযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

কর্মসূচির মধ্যে ছিল:

  • সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ।
  • বিভিন্ন স্থানে গণসমাবেশ।
  • প্রশাসনিক কার্যক্রমে অসহযোগ।
  • দেশব্যাপী মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি।
  • সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান।

আন্দোলনের নেতারা দাবি করেন, এটি হবে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন।

দেশব্যাপী সমর্থন বৃদ্ধি

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বিভিন্ন পেশার মানুষও আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে শুরু করেন।

বিভিন্ন জেলায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

প্রবাসী বাংলাদেশিরাও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

জুলাইয়ের সংঘর্ষ এবং আগস্টের নতুন কর্মসূচিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা শান্তিপূর্ণ সমাধান, সংযম প্রদর্শন এবং মানবাধিকার রক্ষার আহ্বান জানায়।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ পরিস্থিতির ওপর ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে।

পরিস্থিতির চূড়ান্ত উত্তেজনা

এক দফা দাবি ঘোষণার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

আন্দোলনকারীরা ৪ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ৫ আগস্ট “লং মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

অন্যদিকে সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান গ্রহণের কথা জানায়।

আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং উত্তেজনা দেখা দেয়। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সূচনা হয়, যা শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেয়।


৪-৫ আগস্ট: চূড়ান্ত আন্দোলন, লং মার্চ টু ঢাকা, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও সরকার পতন

আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এক দফা দাবিকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কর্মসূচিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লাখো মানুষ অংশ নেন। আন্দোলন তখন আর শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে সম্পৃক্ত হন।

৪ আগস্ট: দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ

৪ আগস্ট দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় মিছিল, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ অনুষ্ঠিত হয়।

দিনভর বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার সমর্থক ব্যক্তিদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বহু স্থানে ইটপাটকেল নিক্ষেপ, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলির ঘটনা ঘটে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এই দিনের সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন জেলায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং শত শত মানুষ আহত হন। ৪ আগস্ট ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিনগুলোর একটি।

লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি

৪ আগস্ট রাতেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৫ আগস্ট “লং মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষকে রাজধানী ঢাকায় এসে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

ঘোষণার পর রাত থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। অনেকেই ব্যক্তিগত যানবাহন, বাস, ট্রেন, মোটরসাইকেল কিংবা পায়ে হেঁটে রাজধানীর দিকে রওনা দেন।

৫ আগস্টের সকাল

৫ আগস্ট সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন।

ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেট, বাংলামোটর, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর, বাড্ডা, মহাখালী, প্রেসক্লাব, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার আন্দোলনকারী অবস্থান নেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ ঢাকামুখী হতে থাকেন। একই সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবি মোতায়েন ছিল।

গণভবনের দিকে অগ্রযাত্রা

দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীদের বড় একটি অংশ রাজধানীর গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন।

পথে বিভিন্ন ব্যারিকেড অতিক্রম করে বিপুলসংখ্যক মানুষ গণভবন এলাকায় পৌঁছে যান। এক পর্যায়ে গণভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ ভেতরে প্রবেশ করেন।

একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ভবনের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ

৫ আগস্ট দুপুরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এর কিছু সময় পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি সামরিক হেলিকপ্টারে ঢাকা ত্যাগ করে প্রথমে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় পৌঁছান এবং পরে দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে যান।

শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের মধ্যে উল্লাস দেখা যায়।

সেনাপ্রধানের ভাষণ

৫ আগস্ট বিকেলে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেনাবাহিনী কাজ করছে।

তিনি সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন।

সেনাপ্রধান আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।

রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ

সরকার পতনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

একই সময়ে কারফিউ প্রত্যাহার, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিভিন্ন স্থানে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও বিশৃঙ্খলা

সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।

কয়েকটি সরকারি স্থাপনা, রাজনৈতিক দলীয় কার্যালয়, ব্যক্তিগত বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর প্রকাশিত হয়।

একই সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার অভিযোগও ওঠে। এসব ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান শুরু করে।

কারামুক্তি ও প্রশাসনিক পরিবর্তন

সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন আনা শুরু হয়।

পরবর্তী কয়েক দিনে অনেক রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে রদবদল শুরু হয়।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের অবসান ঘটে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন রূপরেখা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

জুলাই-আগস্টের এই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে স্থান করে নেয়, যার প্রভাব দেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজে দীর্ঘমেয়াদে আলোচিত হতে থাকে।


অন্তর্বর্তী সরকার, জাতীয় পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

সরকার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার গঠন

সরকার পতনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন।

আলোচনার ভিত্তিতে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মনোনীত করা হয়।

২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টারা শপথ গ্রহণ করেন। নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসন পুনর্গঠন, সংস্কার কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনের জন্য পরিবেশ তৈরির কাজ শুরু করে।

প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনা হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব এবং অন্যান্য বাহিনী যৌথভাবে কাজ শুরু করে।

একই সঙ্গে সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত, ব্যাংক এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসে।

বিচার ও তদন্তের উদ্যোগ

জুলাই-আগস্টের সহিংসতা, প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের পরিবারকে সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দেয়।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা, সহিংসতার কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার আহ্বান জানায়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহকে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে বিশ্লেষণ করে।

জাতিসংঘের তদন্ত ও হতাহতের তথ্য

জুলাই-আগস্টের সহিংসতার পর জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (OHCHR) বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করে।

পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের তথ্য-অনুসন্ধান কার্যক্রমে আন্দোলন চলাকালে ব্যাপক প্রাণহানি, আহত এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়।

বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান রয়েছে। এ কারণে চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণে তদন্ত কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন এবং শিক্ষা কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়।

ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, ফ্রিল্যান্সিং এবং রপ্তানিমুখী বিভিন্ন খাতেও প্রভাব পড়ে।

তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অর্থনৈতিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে সরকার ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ শুরু করে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্ব

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি করে।

এই গণঅভ্যুত্থান রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক সংস্কার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং তরুণ সমাজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দেয়।

একই সঙ্গে এই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে নাগরিক অংশগ্রহণের অন্যতম বৃহৎ অধ্যায় হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা

৫ জুন ২০২৪: হাইকোর্ট ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে।

জুন ২০২৪: দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ: “বাংলা ব্লকেড” কর্মসূচি পালিত হয়।

১৫ জুলাই: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংঘর্ষে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়।

১৬ জুলাই: রংপুরে আবু সাঈদ নিহত হন।

১৮ জুলাই: দেশব্যাপী সহিংসতা বৃদ্ধি, মোবাইল ও পরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ।

১৯ জুলাই: কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন।

২১ জুলাই: আপিল বিভাগ কোটা বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেন।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ: আন্দোলন নতুন দাবিতে এগিয়ে যায়।

আগস্টের শুরু: এক দফা দাবি ও অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা।

৪ আগস্ট: দেশব্যাপী বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ।

৫ আগস্ট: লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি, শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগ।

৮ আগস্ট: ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ।

উপসংহার

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন কীভাবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নিয়ে সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়।

এই ঘটনাপ্রবাহের প্রভাব ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং নাগরিক সমাজের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।