২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুরু হয় সরকারি চাকরির কোটা পুনর্বহালের রায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে। প্রথমে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কোটা ব্যবস্থার সংস্কার বা বাতিল। কিন্তু আন্দোলনে হামলা, সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে থাকলে দাবি শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা ন্যায়বিচার, দায়ীদের জবাবদিহি এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রূপ নেয়।
ক্রমে আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার এবং ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়, কিন্তু আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
শেষ পর্যন্ত তীব্র জনআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন। এরপর রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এরপর নিহত ও আহতদের বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের দাবি সামনে আসে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এই আন্দোলন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
আমার কাছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ঘটেছিল, সেটি ছিল একটি গণঅভ্যুত্থান। আর গণঅভ্যুত্থান কারও বাপের সম্পত্তি নয়। এর দাবিদার কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল হতে পারে না। এটি ছিল একটি দেশের আপামর জনতার – কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবং সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের সংঘাত হয়েছে। এটি ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে জনতার আন্দোলন, যেখানে শেষ পর্যন্ত বিজয় হয়েছে জনতার।
এই আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রের পক্ষে থেকে যারা জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ নিহত হন। প্রশ্ন হলো, একটি গণঅভ্যুত্থানে রাষ্ট্রের পক্ষে অস্ত্রধারী সদস্যদের মৃত্যুর বিচার চাওয়া কতটা যৌক্তিক? নাকি জনতার পক্ষে জীবন দেওয়া জুলাই যোদ্ধাদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করাই অধিক যৌক্তিক?
আরেকটি বিষয়ও আমাদের মনে রাখা দরকার। আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বাহিনী সরাসরি জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর কাছ থেকে গুলি চালানো বা নির্বিচারে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত এবং অপরাধের দায় ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করা উচিত।
একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিন্তু কোনো হত্যাকাণ্ড, লুটপাট বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না – এমন অনেক নেতা-কর্মীও পরবর্তী সময়ে মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন। একইভাবে, এমন অনেক পুলিশ সদস্যও নিহত হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ওপর সহিংসতা বা অপরাধে জড়িত থাকার কোনো অভিযোগ ছিল না।
গণঅভ্যুত্থানের মতো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় এমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। কিন্তু ইতিহাসের বিচার হওয়া উচিত ব্যক্তি কী করেছেন, তার ভিত্তিতে; তিনি কোন দলের ছিলেন বা কোন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, শুধু সেটার ভিত্তিতে নয়। ন্যায়বিচার তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন প্রকৃত অপরাধী শাস্তি পাবে এবং নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক অর্জন নয়; এটি সমগ্র জাতির আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তাই ইতিহাসের মূল্যায়নও হওয়া উচিত তথ্য, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে – আবেগ, প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।