একজন সাংবাদিকের কাজ শুধু ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করা আর ফিরে এসে নিউজ লেখা নয়। ভালো রিপোর্টিং শুরু হয় তারও আগে – প্রস্তুতি থেকে।
একজন রিপোর্টার যদি আগে থেকেই জানেন কোথায় যাচ্ছেন, কী নিয়ে রিপোর্ট করবেন, কার সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং কোন তথ্যগুলো নিশ্চিত করতে হবে, তাহলে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।
অন্যদিকে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই ঘটনাস্থলে গেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যেতে পারে, ভুল প্রশ্ন হতে পারে, এমনকি পুরো ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।
খবর পাওয়ার পর প্রথম কাজ কী?
কোনো ঘটনার খবর পাওয়ার পর প্রথমেই উত্তেজিত হয়ে নিউজ লেখা শুরু করা উচিত নয়।
আগে বিষয়টি বুঝতে হবে।
নিজেকে প্রশ্ন করুন:
কী ঘটেছে?
কোথায় ঘটেছে?
কখন ঘটেছে?
কে আমাকে এই তথ্য দিয়েছে?
ঘটনাটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আমাকে কি ঘটনাস্থলে যেতে হবে?
এই প্রাথমিক ধারণা তৈরি হলেই পরবর্তী কাজ সহজ হবে।
ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে কিছু তথ্য জেনে নিন
ধরুন, আপনি খবর পেলেন একটি কারখানায় আগুন লেগেছে।
ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগে যতটুকু সম্ভব জেনে নিন:
কারখানার নাম কী?
কোথায় অবস্থিত?
আগুন কখন লেগেছে?
ফায়ার সার্ভিস গেছে কি না?
কেউ আহত হয়েছে কি না?
পুলিশ ঘটনাস্থলে আছে কি না?
এসব তথ্যের সবগুলোই হয়তো নিশ্চিত হবে না। কিন্তু প্রাথমিক ধারণা থাকলে ঘটনাস্থলে গিয়ে সঠিক প্রশ্ন করতে পারবেন।
কী কী সঙ্গে নেবেন?
রিপোর্টিংয়ে বড় কোনো সরঞ্জাম সবসময় প্রয়োজন হয় না। একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম অনেক সময় তার মোবাইল ফোন, নোটবুক এবং নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।
প্রয়োজনে সঙ্গে রাখতে পারেন:
- মোবাইল ফোন
- চার্জার বা পাওয়ার ব্যাংক
- নোটবুক ও কলম
- অডিও রেকর্ড করার ব্যবস্থা
- প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র
- ঘটনাস্থলের তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা
মোবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আটকে যেতে পারে। তাই মাঠে বের হওয়ার আগে ফোনের চার্জ দেখে নেওয়াও সাংবাদিকের প্রস্তুতির অংশ।
কার সঙ্গে কথা বলবেন?
ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথম যে ব্যক্তিকে পাওয়া গেল, তার কাছ থেকেই পুরো ঘটনা জেনে নেওয়া ঠিক নয়।
কারণ প্রত্যেকের দেখা বা জানা তথ্য একরকম নাও হতে পারে।
ঘটনার ধরন অনুযায়ী কথা বলতে পারেন:
প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে
ভুক্তভোগী বা পরিবারের সঙ্গে
পুলিশের সঙ্গে
ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে
প্রশাসনের কর্মকর্তার সঙ্গে
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে
বিশেষজ্ঞের সঙ্গে
কার বক্তব্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটি ঘটনার ওপর নির্ভর করবে।
একই তথ্য একাধিক জায়গা থেকে যাচাই করুন
ধরুন, একজন প্রত্যক্ষদর্শী বললেন দুর্ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছেন।
এখন সেটিই চূড়ান্ত সংখ্যা ধরে নিউজ লেখা ঠিক হবে না।
সম্ভব হলে পুলিশ, হাসপাতাল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তথ্যটি নিশ্চিত করুন।
একজন বললেন একটি সংখ্যা, অন্যজন বললেন আরেকটি – তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত সতর্ক থাকুন।
একটি সূত্র তথ্য দিতে পারে, কিন্তু একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র তথ্যকে শক্তিশালী করে।
ঘটনাস্থলে শুধু প্রশ্ন করবেন না, দেখবেনও
রিপোর্টারের চোখ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাস্থলে গিয়ে চারপাশ লক্ষ্য করুন।
কী দেখা যাচ্ছে?
মানুষ কী করছে?
পরিস্থিতি কেমন?
কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে?
কোনো গুরুত্বপূর্ণ নথি, সাইনবোর্ড বা তথ্য চোখে পড়ছে কি?
তবে কোনো দৃশ্য দেখে নিজের মতো করে অর্থ দাঁড় করানো যাবে না।
আপনি যা দেখেছেন, সেটি এবং যা শুনেছেন, সেটি আলাদা করে মনে রাখুন।
নোট নেওয়ার অভ্যাস করুন
সব তথ্য মাথায় রাখার চেষ্টা করবেন না।
নোট করুন।
বিশেষ করে:
- নাম
- পদবি
- সময়
- স্থান
- সংখ্যা
- ফোন নম্বর
- গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য
- মামলার নম্বর
- প্রতিষ্ঠানের নাম
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার পরিচয়
একটি নাম বা সংখ্যায় ছোট ভুলও পরে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
বক্তব্য রেকর্ড করলে অনুমতি ও পরিস্থিতি বিবেচনা করুন
সাক্ষাৎকার বা বক্তব্য রেকর্ড করার আগে পরিস্থিতি বুঝে কাজ করুন।
বিশেষ করে সংবেদনশীল বিষয়ে কথা বলার সময় ব্যক্তির নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
সব তথ্য প্রকাশযোগ্য নয়। কোনো ব্যক্তি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু বললেই সেটি সরাসরি সংবাদে ব্যবহার করা যাবে – এমন নয়।
সাংবাদিককে বুঝতে হবে কোন তথ্য অন-দ্য-রেকর্ড, কোনটি ব্যাকগ্রাউন্ড, আর কোনটি প্রকাশ না করাই উচিত।
প্রশ্ন করার আগে প্রশ্ন তৈরি করুন
ঘটনাস্থলে গিয়ে মাথায় যা আসে তাই প্রশ্ন করতে থাকলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে যেতে পারে।
আগে কয়েকটি প্রশ্ন লিখে নিন।
যেমন কোনো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে:
দুর্ঘটনা কখন ঘটেছে?
ঠিক কোথায় ঘটেছে?
কীভাবে ঘটেছে?
কতজন আহত বা নিহত হয়েছেন?
তাদের কোথায় নেওয়া হয়েছে?
পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
কোনো মামলা হয়েছে কি?
এরপর উত্তর অনুযায়ী নতুন প্রশ্ন করুন।
একটি প্রশ্নের উত্তর থেকেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে
ধরুন, পুলিশ বলল:
“ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।”
তখন এখানেই থেমে যাবেন না।
প্রশ্ন করতে পারেন:
“কোন বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে?”
“কোনো মামলা হয়েছে কি?”
“কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি?”
এ ধরনের ফলো-আপ প্রশ্ন অনেক সময় রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করে আনে।
শুধু পরিচিত সূত্রের ওপর নির্ভর করবেন না
একজন রিপোর্টারের কয়েকজন নিয়মিত সূত্র থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু কোনো বিষয়ে সবসময় একই ব্যক্তির ওপর নির্ভর করলে তথ্যের একটি দিকই সামনে আসতে পারে।
তাই প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সূত্র খুঁজুন।
একই ঘটনার ভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নিন।
এতে রিপোর্টটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
তথ্য আর গুজব আলাদা করুন
ঘটনাস্থলে অনেক কথা শুনতে পারেন।
কেউ বলবে একজন মারা গেছেন।
অন্যজন বলবে ১০ জন মারা গেছেন।
আরেকজন হয়তো বলবে ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে।
এসব কথার সবগুলো সংবাদ নয়।
আপনার কাজ হলো শোনা তথ্যকে যাচাইযোগ্য তথ্যতে পরিণত করা।
যেটি নিশ্চিত নয়, সেটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লিখবেন না।
রিপোর্টিং শেষে আবার তথ্য মিলিয়ে নিন
ঘটনাস্থল থেকে ফিরে নিউজ লেখার আগে আপনার নোটগুলো আরেকবার দেখুন।
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ফোন করে কোনো তথ্য নিশ্চিত করুন।
বিশেষ করে:
নাম
পদবি
সংখ্যা
স্থান
সময়
মামলা বা আইনি তথ্য
এসব আবার মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
একজন রিপোর্টারের প্রস্তুতি আসলে এখানেই শেষ নয়
সময়ের সঙ্গে একজন সাংবাদিক নিজের একটি কাজের পদ্ধতি তৈরি করেন।
কে কোন বিষয়ে ভালো তথ্য দিতে পারেন, কোন সরকারি ওয়েবসাইটে কী তথ্য পাওয়া যায়, কোন নথি কোথা থেকে সংগ্রহ করতে হয়, কোন ঘটনার ক্ষেত্রে কার বক্তব্য নেওয়া জরুরি – এসব অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে তৈরি হয়।
শুরুতে হয়তো সময় বেশি লাগবে।
কিন্তু নিয়মিত কাজ করতে করতে আপনি বুঝতে পারবেন, একটি ঘটনা সামনে আসার পর কোন পথে এগোতে হবে।
শেষ কথা
ভালো রিপোর্টিংয়ের বড় অংশই হলো প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ এবং যাচাই।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভালো প্রশ্ন করা যেমন জরুরি, তার আগে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নেওয়াও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখবেন:
একজন রিপোর্টার যত ভালো প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে যান, তার ভালো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – শুধু তথ্য সংগ্রহ করবেন না, তথ্যের উৎস এবং সত্যতাও সংগ্রহ করুন।
কারণ একটি ভালো রিপোর্টের ভিত্তি শুরু হয় নিউজ লেখার সময় নয়, তথ্য সংগ্রহের সময়ই।
পরবর্তী পর্ব: সংবাদের সূত্র কী? সূত্র কত ধরনের হতে পারে।