একজন ওসি থানায় নতুন যোগ দিলেন।
তারপর কী হয়?
কেউ চায় তিনি তাদের রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করুন, কেউ চায় তাদের প্যানেলের হয়ে কাজ করুন, কেউ চায় তাদের কথামতো মামলা হোক, কেউ চায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ থাকুক,
আর কেউ চায়, ওসি যদি তাদের কথা না শোনেন – তাহলে তাকে বিতর্কিত করে থানা থেকে সরিয়ে দিতে হবে!
সাভারেও কি এখন আবারও সেই খেলাই শুরু হয়েছে?
থানায় নতুন কোনো অফিসার ইনচার্জ আসলেই তাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিভিন্ন চক্র। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা চান, ওসি তাদের গোলাম হয়ে কাজ করুক।
যেন পুলিশ তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি!
আর এই খেলায় রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি কিছু সাংবাদিকও নেমে পড়েন।
মিডিয়ায় একটা গ্রুপ আছে, যাদেরকে আমরা সোজা বাংলা ভাষায় “মাফিয়া” বলতে পারি।
এরা কী করে জানেন?
ওসিকে নিয়ে পজিটিভ কোনো নিউজ করলে বলবে, “নিজেদের কোনো স্বার্থে তাকে নিয়ে ভালো ভালো কথা লিখেছে।”
আবার ওসির বিরুদ্ধে লিখলে ? ওসির কানে কানে গিয়ে বলবে, “ওই দেখেন, আপনার বিরুদ্ধে লিখছে। পাগল, সাইকো!”
অর্থাৎ আপনি ভালো লিখলেও সমস্যা, খারাপ লিখলেও সমস্যা!
সমস্যা আসলে কোথায়? আপনি কার পক্ষে দাঁড়াচ্ছেন, সেটাই তাদের কাছে মূল বিষয়।
এবার আসি “জুলাই যোদ্ধা” প্রসঙ্গে!
জুলাই যোদ্ধা পরিচয়দাতা কিছু ব্যক্তি ওসি সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছেন, দেখলাম।
তারা বোঝাতে চাচ্ছেন, ওসি ছাত্র-জনতার বিপক্ষে ছিলেন। এই কারণে তাকে সাভার মডেল থানায় রাখা যাবে না।
আমি খুব পরিষ্কারভাবে একটা প্রশ্ন করতে চাই।
যদি তাদের উদ্দেশ্য সত্যিই অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হয়, তাহলে সাভারের বুকে যারা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরিয়েছে, তারা কোথায়?
হাজারো অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এমন অসংখ্য আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মী রয়েছেন, যারা এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এবং কর্মীতে কনভার্ট হয়েছেন।
কই?
তথাকথিত জুলাই যোদ্ধাদের তো দেখলাম না তাদের নিয়ে কথা বলতে!
কখনো তো দেখলাম না তাদের সাভার থেকে বের করে দেওয়ার দাবি তুলতে!
তাহলে প্রশ্ন উঠবেই – সমস্যা কি সত্যিই অপরাধ, নাকি সমস্যা হচ্ছে ওসি সাইফুল আলম?
এবার আসি কিছু সাংবাদিকের কথায়!
কিছু সাংবাদিক দেখলাম ওসির বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে বাহবা কুড়াচ্ছেন।
লেখা হচ্ছে – ওসি খুব খারাপ মানুষ ছিলেন। আগের থানায় তিনি মানুষ মেরেছেন, গুলি করেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
কেন ভাই?
এর আগে তো তিনি শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত হয়ে পুরস্কারও পেয়েছেন।
সেগুলো কোথায় গেল?
যদি কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকে, তদন্ত হোক। প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা হোক।
কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়।
অভিযোগ উঠলেই একজন মানুষ অপরাধী হয়ে যায় না।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, তিনি অপরাধী।
তাহলে যে বিষয় নিয়ে আপনারা লেখালেখি করছেন, সেটাই যদি আপনাদের মূল বিষয় হয়, তাহলে ওই একই অপরাধে অপরাধী এমন অনেকেই তো সাভারে রাজনীতির মাঠ কাঁপাচ্ছেন।
তাদের বিরুদ্ধে আপনাদের লেখা কোথায়?
উনার থেকেও গুরুতর অপরাধীরা আগের চেয়ে আরও বেশি উৎসাহের সঙ্গে অপকর্ম করছে।
তাদের নিয়ে তো লিখেন না!
আসল খেলাটা কোথায় জানেন?
রাজনৈতিক দলগুলোতে সবাই একমত থাকে না।
বিভিন্ন মতের কারণে একাধিক প্যানেল তৈরি হয়।
প্রতিটি প্যানেলের নেতারা চান, ওসি তাদের হয়ে কাজ করুক।
এই প্যানেলগুলোর মধ্যে যেই প্যানেলটি বেশি শক্তিশালী, তারা চায় তাদের পছন্দের ওসি তাদের এলাকায় থাকুক।
আর সেটা না হলে?
বাকিরা অপসাংবাদিকদের দিয়ে পেইড সংবাদ প্রকাশ করাবে।
ওসিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করবে।
তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ ছড়াবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাবে।
তারপর?
ফলাফল শুরু – ওসিকে থানা ছাড়তে হবে!
প্রকৃত অপরাধীদের নিয়ে লিখবেন না কেন?
এইসব সাংবাদিকরা প্রকৃত অপরাধীদের নিয়ে কিন্তু কখনোই লিখবে না।
কারণ তারা যত বেশি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে পারবে, সাংবাদিকদের পকেটে তত বেশি টাকা ঢুকবে।
নিজেদের জীবিকা ও উপার্জনের রাস্তা তো কেউ বন্ধ করতে চাইবে না।
এটা খুব স্বাভাবিক বিষয়!
কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে –
সাংবাদিকতার নামে অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করা কি সাংবাদিকতা?
আপনি সাংবাদিক।
আপনার লেখা দেখে মনে হবে আপনি অপরাধীদের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
খুব ভালো কথা।
তো ভাই, লিখেন না! সকলকে নিয়েই লিখেন না!
অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে লেখাটাকে কি সাংবাদিকতা বলে?
এটাকে তো বলে দালালি!
“জুলাই যোদ্ধা” পরিচয়ের আড়ালেও যদি স্বার্থ থাকে?
আর কিছু অতি উৎসাহী আছেন, যারা নিজেদেরকে বলেন “জুলাই যোদ্ধা”।
এইসব তথাকথিত জুলাই যোদ্ধাদের প্রধান কাজ হচ্ছে প্রতিটি স্থানে, প্রতিটি বিষয়েই নিজেদেরকে জুলাই যোদ্ধা বলে জাহির করা এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই –
জুলাই কারো বাপ-দাদার সম্পত্তি না।
এই দেশের সাধারণ মানুষ যদি অংশগ্রহণ না করতেন, তাহলে জুলাই হতো না।
আপনাদের নিজেদের দলেই অনেক আওয়ামী লীগ আছে।
সাভারের আনাচে-কানাচে চাঁদাবাজি আগের থেকে ব্যাপক হারে বেড়েছে।
মাদক বেড়েছে।
অপরাধ বেড়েছে।
ওইগুলো চোখে দেখেন না, জুলাই যোদ্ধা ভাইয়েরা?
আসল সমস্যা হচ্ছে ওসি!
এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে –
কোনো ভালো মানুষ যখন থানায় ওসি হিসেবে আসে, তখন অপরাধীদের আস্তানাগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
আর এইসব স্পট থেকে এরা ভাগ পায়।
সেই ভাগের টাকা পাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে – এই কারণেই একেকজনের মাথা ঠিক থাকে না!
অপরাধের আস্তানা বন্ধ হলে শুধু অপরাধীর ক্ষতি হয় না, অনেকের “ব্যবসাও” বন্ধ হয়ে যায়।
তখন শুরু হয় ওসিকে সরানোর খেলা।
সাভার থানার সেই এসআইকে নিয়েও একই খেলা?
সম্প্রতি দেখলাম, সাভার থানার এক এসআইকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
উনি এখন সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
একদল তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করছেন।
আবার আরেক দল তাকে নির্দোষ দাবি করে সংবাদ প্রকাশ করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছেন।
যারা ওই উপপরিদর্শককে নির্দোষ দাবি করছেন, অপর দল তাদেরকে বলছেন পুলিশের দালাল।
আবার যারা দালাল বলছেন, তারাও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার ব্যাপক দালালি করেছেন।
অর্থাৎ যার যার স্বার্থ, তার তার সত্য!
নিজের স্বার্থে লাগলে একজন অপরাধী।
স্বার্থে না লাগলে সেই একই মানুষ নির্দোষ!
“সুশীল” সাংবাদিকদের কাছে একটা প্রশ্ন!
কোনো সমস্যাই সমস্যা না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগে।
এই যে এত এত ভালো মানুষ!
এত এত সুশীল সাংবাদিক!
তাদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় –
“আপনাদের বৈধ আয়ের উৎস কী?”
দেখবেন, অনেকেরই জবান বন্ধ হয়ে গেছে।
এবার আমার নিজের কথাই বলি!
আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন কোনো অপরাধীর অপরাধ তুলে ধরতে গেলেই আমাকে কখনো বিএনপি ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হতো।
আবার কখনো জামায়াত-শিবিরের ট্যাগ লাগানো হতো।
বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর যখন কোনো অপরাধীর মুখোশ উন্মোচন করতে গেলাম, তখন আবার আমাকে কখনো এনসিপির ট্যাগ লাগানো হয়েছে।
আবার কখনো আওয়ামী লীগের ট্যাগও লাগানো হয়েছে।
এবারও কিন্তু জামায়াতের ট্যাগ লাগাতে ভুলেনি তারা!
প্রশ্ন হচ্ছে –
সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যাটা হচ্ছে ওই যে বললাম –
যারা অপরাধ করে, আমার কাছে তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হচ্ছে তারা অপরাধী।
তারা কোন দল করে?
তারা কার আত্মীয়?
কোন নেতার লোক?
এসব বিষয় নিয়ে ভাবার সময় এবং ইচ্ছা – কোনোটাই আমার নেই।
আর তাদের চোখে এটাই আমার অপরাধ!
যার কারণে বিগত দিনে আমাকে কিন্তু চাঁদাবাজের ট্যাগও লাগানো হয়েছে।
অপরাধের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কটা বুঝতে হবে!
এখন যারা অপরাধ করে, তারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারেই করে।
চাঁদাবাজি, লুটপাট, অবৈধ দখল, মামলা বাণিজ্য, মাদক সিন্ডিকেট ইত্যাদি চালাতে গেলে ক্ষমতার প্রয়োজন হয়।
আর সেই ক্ষমতাটা আসে রাজনৈতিক দলের শেল্টার থেকে।
কাজেই এই সকল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে হলে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতেই হয়।
তো আপনি যে অপরাধীর বিরুদ্ধেই লিখবেন, দেখা যাবে সে অবশ্যই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা কর্মী অথবা তাদের আত্মীয়-স্বজন।
তাহলে কি অপরাধীর দল দেখে লিখতে হবে?
আপনারা বলেন, “ভাই, আপনি সবার পিছনেই লাগেন!”
অনেকে তো আমাকে বলেছেন –
“ভাই, আপনি সবার পিছনেই লাগেন। সবাইকে নিয়েই লেখেন।”
তো আপনাদের মতে আমার কী করা উচিত?
যেই পক্ষ টাকা দেবে, সেই পক্ষের হয়ে অপর পক্ষের বিরুদ্ধে লিখতে হবে?
দালালি করতে হবে?
চামচামি করতে হবে?
এটাই কি সাংবাদিকতা?
“ভাই, আপনি কোন দলের?”
অনেকেই আবার প্রশ্ন করেন –
“ভাই, আপনি কোন দলের?”
কেন ভাই?
দল ছাড়া কিছু বুঝেন না?
একজন সংবাদকর্মীকে দল কেন করতে হবে?
ব্যক্তি হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি সমর্থন বা ভালোবাসা থাকতেই পারে।
কিন্তু তাই বলে সেই দলের নেতাকর্মীদের অপরাধ ধামাচাপা দিতে হবে কোন যুক্তিতে?
আপনি আপনার নিজের ঘরের ভেতরে ঘটা অপরাধের বিচার যদি করতে না পারেন, তাহলে আপনি আরেকজনের ঘরের বিচার করতে যাবেন কোন লজ্জায়?
শেষ কথা!
আমার কাছে অপরাধীর সবচেয়ে বড় পরিচয় –
সে অপরাধী।
সে কোন দলের, কার লোক, কার আত্মীয়, তার কত টাকা, তার পেছনে কোন নেতা আছে – এসব পরিচয় অপরাধকে বৈধ করে দিতে পারে না।
অপরাধী যে দলেরই হোক, অপরাধী হিসেবেই তার বিচার হতে হবে।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে কারও অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক।
প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা হোক।
কিন্তু উদ্দেশ্য যদি হয় ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা আর্থিক স্বার্থে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বিতর্কিত করে সরিয়ে দেওয়া, তাহলে সেটাকে সাংবাদিকতা, জনস্বার্থ কিংবা জুলাইয়ের চেতনা – কোনো নামেই চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
একই অপরাধে একজনের বিরুদ্ধে কলম ধরবেন আর আরেকজনকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ছেড়ে দেবেন – এই দ্বিচারিতা বন্ধ করুন।
সবার জন্য একই মাপকাঠি রাখুন।
অপরাধী যে দলেরই হোক, তার বিরুদ্ধে লিখুন।
যে পুলিশ কর্মকর্তা ভালো কাজ করেন, তার ভালো কাজও লিখুন।
যার বিরুদ্ধে সত্যিকারের অভিযোগ আছে, প্রমাণসহ তার বিরুদ্ধেও লিখুন।
কিন্তু টাকার বিনিময়ে কাউকে টার্গেট করা, রাজনৈতিক স্বার্থে কাউকে বিতর্কিত করা, আর নিজের পছন্দের লোককে বাঁচিয়ে রাখা –
এগুলো সাংবাদিকতা নয়, এগুলো দালালি, আর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সত্য।
সেই সত্য যেন কারও টাকা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থের কাছে বিক্রি না হয়।