বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্দোলন নতুন কোনো ঘটনা নয়। অধিকার আদায়, গণতন্ত্র, বৈষম্যবিরোধী দাবি কিংবা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে বিভিন্ন সময়ে মানুষ রাজপথে নেমেছে। এসব আন্দোলনের ইতিহাসে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই সবচেয়ে দৃশ্যমান। রিকশাচালক, শ্রমিক, দিনমজুর, নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান, বেকার তরুণ কিংবা শিক্ষার্থী, রাজপথের ঝুঁকি অনেক সময় তারাই সবচেয়ে বেশি বহন করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আন্দোলনের যে মূল্য সাধারণ মানুষ দেয়, আন্দোলনের পর তার সুফল কতটা তাদের ঘরে পৌঁছায়?
মিছিলের সামনের সারিতে থাকা মানুষটির কথা ভাবুন। পুলিশের লাঠি তার শরীরে পড়ে, গ্রেপ্তার হলে তার পরিবার বিপদে পড়ে, আহত হলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হয় স্বজনদের। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারান। কারও জীবনে নেমে আসে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা। আবার কোনো কোনো পরিবার হারায় তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে।
একটি আন্দোলনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এসব মানুষ পরিণত হন ‘শহীদ’, ‘আহত’ কিংবা ‘আন্দোলনকারী’ হিসেবে। কিন্তু তাদের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়টি কতটা আলোচনায় আসে?
আন্দোলন শেষ হওয়ার পর রাজপথের সেই মানুষটি অনেক সময় ফিরে যান আগের জীবনে। আহত ব্যক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দীর্ঘ লড়াইয়ে পড়েন। নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সামলাতে হয় শোকের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। অথচ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনেকের জন্য আন্দোলন হয়ে ওঠে বৃহত্তর রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সোপান।
এখানেই আমাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নটি করতে হয়।
ত্যাগ যদি সাধারণ মানুষের হয়, তাহলে ক্ষমতার সুবিধা কারা ভোগ করেন?
অবশ্যই সব রাজনৈতিক নেতা বা আন্দোলনের সংগঠককে একই কাঠামোর মধ্যে বিচার করা যাবে না। ইতিহাসে এমন বহু নেতৃত্ব রয়েছে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে থেকেছেন এবং নিজেরাও নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রাজনৈতিক আন্দোলনকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে।
সমস্যাটা তখনই গভীর হয়, যখন আন্দোলনের কর্মীকে মানুষ হিসেবে নয়, কেবল রাজনৈতিক শক্তির ‘সংখ্যা’ হিসেবে দেখা হয়।
একজন আহত কর্মীর জীবিকা কীভাবে চলবে, তার সন্তান পড়াশোনা করতে পারবে কি না, তার পরিবারের চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা কী হবে, কর্মক্ষমতা হারানো মানুষটির ভবিষ্যৎ কী, এসব প্রশ্ন আন্দোলনের উত্তেজনার সময় খুব কমই সামনে আসে। কিন্তু রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে আন্দোলন শেষ হওয়ার পর এসব প্রশ্নই তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘শহীদ’ শব্দটি অত্যন্ত আবেগময় ও শক্তিশালী। কিন্তু কোনো মানুষকে শুধু শহীদের মর্যাদা দিলেই তার পরিবারের দায় শেষ হয়ে যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিহত ও আহতদের যথাযথ স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তাদের আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষের পাশে দীর্ঘমেয়াদে দাঁড়ানো।
কারণ একটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মূল্য শুধু কতজন মানুষ রাজপথে নেমেছিল, কতটি স্লোগান উঠেছিল কিংবা কত বড় সমাবেশ হয়েছিল, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং আন্দোলনের পর সাধারণ মানুষের জীবন কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও উন্নত হলো, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের অন্যতম মানদণ্ড।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে।
কেন দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষই বারবার রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বহন করবে?
রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য যদি একইভাবে প্রতিফলিত হয়, তাহলে আন্দোলনের চরিত্রও অসম হয়ে পড়ে। যার জীবিকা অনিশ্চিত, তার জন্য একদিনের কাজ হারানোও বড় ক্ষতি। আর যার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বেশি, তার জন্য একই ঝুঁকির মূল্য তুলনামূলকভাবে কম।
ফলে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়।
আমরা যদি সত্যিই গণতান্ত্রিক রাজনীতি চাই, তাহলে রাজনৈতিক কর্মীকে শুধু মিছিলের লোক হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে। তাকে নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। তার মতামতের মূল্য থাকতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার অংশগ্রহণ থাকতে হবে এবং আন্দোলনের সুফল বণ্টনের ক্ষেত্রেও তার অধিকার থাকতে হবে।
রাজনীতির ভাষায় ‘কর্মী’ শব্দটি সম্মানের। কিন্তু সেই কর্মী যদি কেবল ভোটের সময়, মিছিলের সময় কিংবা সংঘাতের সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, আর বাকি সময়ে তার জীবন ও ভবিষ্যৎ উপেক্ষিত থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: তিনি কি সত্যিই রাজনৈতিক অংশীদার, নাকি কেবল ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ার?
এই প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন।
যে মানুষটি রাজপথে রক্ত দেয়, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে তার অংশীদারিত্ব কতটুকু?
যে পরিবার তার সন্তান হারায়, আন্দোলনের পর সেই পরিবারের পাশে কে থাকে?
যে তরুণ আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারায়, তার ভবিষ্যতের দায় কে নেয়?
আর যে সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশ নেয়, ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও যদি তার জীবন একই অনিশ্চয়তায় থেকে যায়, তাহলে সেই পরিবর্তনের অর্থ কী?
রাজনীতির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন আন্দোলনের পর শুধু নেতৃত্বের অবস্থান বদলাবে না, সাধারণ মানুষের জীবনও বদলাবে।
সিঁড়ির সবচেয়ে নিচের ধাপে দাঁড়ানো মানুষটিই যদি বারবার অন্যকে উপরে উঠিয়ে দেয়, অথচ নিজে একই জায়গায় থেকে যায়, তাহলে একসময় তাকে প্রশ্ন করতেই হবে:
“আমার ত্যাগ যদি পরিবর্তনের পুঁজি হয়, তাহলে সেই পরিবর্তনের অংশীদার আমি কতটা?”
এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু গণতন্ত্রে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার অধিকারই তো নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার।
কারণ কোনো আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন ক্ষমতার হাতবদল নয়।
সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, যে মানুষটি পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় নেমেছিল, পরিবর্তনের পরে তার নিজের জীবনটাও বদলেছে কি না।