যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই হয়তো এখনো গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারেননি, কেন ‘জুলাই’ একসময় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল এবং কেন এত বড় একটি পতনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী অন্ধত্ব অনেক সময় মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও বাস্তবতার ভাষা বুঝতে দেয় না। অথচ ইতিহাস বারবার আমাদের দেখিয়েছে, মানুষের কথা না শুনলে একসময় সেই নীরব ক্ষোভই বড় পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু একই সঙ্গে আজ আরেকটি প্রশ্নও সামনে এসেছে। যে তরুণরা রক্ত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাইকে সফল করেছিল, মাত্র দুই বছরের মাথায় তাদের অনেকেই কি বুঝতে পারছে, কেন ‘জুলাই’ আজ অনেক মানুষের কাছে ব্যঙ্গ, ট্রল কিংবা নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে? যে জুলাইয়ের স্বপ্নকে সামনে রেখে পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কোথায় ব্যর্থতা তৈরি হলো, সেটিও কি আত্মসমালোচনার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন নয়?
বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে যদি শেষ পর্যন্ত আবার বৈষম্যের সমাজই তৈরি হয়, তাহলে সেই লড়াইয়ের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বরফের একটি বড় খণ্ডকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার পর যদি সেই টুকরোগুলোকে আবার একইভাবে জমতে দেওয়া হয়, তাহলে পরিবর্তনের অর্থ কী দাঁড়ায়?
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বোধহয় এমনই। মানুষ অনেক সময় অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না।
একই প্রশ্ন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত মানুষদের প্রতিও। আপনারাও একটু গভীরভাবে ভাবুন, কেন ‘জুলাই’ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল? কেন আজ সেই ‘জুলাই’ নিয়েই সমাজের একটি অংশের মধ্যে বিরূপতা, ব্যঙ্গ কিংবা ট্রলের প্রবণতা তৈরি হয়েছে? অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চর্চাকে কীভাবে আরও গণমুখী, সহনশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ করা যায়, সেটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
কারণ এই দেশের রাজনীতিতে পরমতসহিষ্ণুতার জায়গাটি দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। কেউ সত্য কথা বললেই তাকে কোনো না কোনো রাজনৈতিক ‘ট্যাগ’ দিয়ে চিহ্নিত করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কে কী বলল, তার যুক্তি কী, তার বক্তব্যের সত্যতা কতটুকু, সেগুলো যাচাই করার পরিবর্তে আমরা অনেক সময় আগে ঠিক করে ফেলি, মানুষটি কোন দলের।
এই ট্যাগিংয়ের সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক অন্ধত্বই একেকটি পতনের বীজ তৈরি করে।
তাই বাংলাদেশের সকল মানুষের কাছে আমার একটি প্রশ্ন:
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ভালোবাসা কি অপরাধ? শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসা কি অপরাধ?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দুজনই বাংলাদেশের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকা, দর্শন কিংবা ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়েও বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তাঁদের স্মরণ করলেই কেন সেটি দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যাবে?
এটি তো হওয়ার কথা নয়।
আমার কাছে মনে হয়, এর পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করে।
ইতিহাসের ভিন্ন ব্যাখ্যা: দুই রাজনৈতিক ধারার মানুষ একই ঐতিহাসিক ঘটনাকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেন।
দলীয় রাজনীতির অতিরিক্ত প্রভাব: জাতীয় নেতাদেরও অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট দলের রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ক্ষমতার রাজনীতি: অতীতের ইতিহাসকে অনেক সময় বর্তমান রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসা: দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংঘাত সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে।
জাতীয় পরিচয়ের বদলে দলীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার: ‘আমি আগে বাংলাদেশের মানুষ’ এই পরিচয়ের চেয়ে ‘আমি কোন দলের’ পরিচয়টি বড় হয়ে ওঠে।
কিন্তু একটি পরিণত জাতির জন্য প্রয়োজন হতে পারে সম্মানের ক্ষেত্রে ঐক্য এবং মতের ক্ষেত্রে ভিন্নতা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধা করতে হলে জিয়াউর রহমানকে অস্বীকার করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আবার জিয়াউর রহমানকে সম্মান করতে হলে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করাও জরুরি নয়।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের মানুষ শোক করবেন, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএনপির মানুষ শ্রদ্ধা জানাবেন, এটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁদের দুজনকেই বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখার এবং যথাযথ সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
ইতিহাস কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। ইতিহাস একটি জাতির সামগ্রিক স্মৃতি, সংগ্রাম, ভুল, অর্জন ও আত্মত্যাগের দলিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা কি ইতিহাস নিয়ে সারাজীবন লড়াই করব? নাকি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিভাজনমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলব?
রাজনীতি থাকুক প্রতিদ্বন্দ্বিতার, ইতিহাস থাকুক গবেষণা ও বিতর্কের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশ ও বাঙালির জাতীয় ঐক্য যেন কোনো দলীয় বিভাজনের কাছে পরাজিত না হয়।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই কিছু অতিউৎসাহী নেতা-কর্মী থাকেন। তাঁদের উগ্রতা কিংবা অসহিষ্ণুতার কারণে কোনো গুণী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জন্য দোয়া করতে গিয়ে, শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কিংবা ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে কাউকে যেন অপমানিত বা রক্তাক্ত হতে না হয়। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সবাইকে সহনশীল আচরণ করতে হবে। যার যার প্রাপ্য সম্মান তাকে দিতে হবে। প্রতিহিংসার অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। রাজনীতি হোক সৌহার্দ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের মাধ্যমে।
উপরে ভালো থাকুন দেশের সকল গুণীজন, যাঁদের ঘাম, রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের এই বাংলাদেশ, পেয়েছি লাল-সবুজের পতাকা।
৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে দলমত নির্বিশেষে সবাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করবেন, এই প্রত্যাশা কি খুব বেশি কিছু চাওয়া?
ঠিক একইভাবে, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো এবং একই সঙ্গে ১৫ আগস্ট নিহত সকলের জন্য দোয়া করার মানসিকতাও কি আমাদের তৈরি হতে পারে না?
কারও প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানেই অন্য কারও প্রতি অসম্মান করা নয়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করলে জিয়াউর রহমানকে ভুলে যেতে হবে না। জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করলে বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করতে হবে না। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তাঁদের স্মরণ করার অধিকার, শ্রদ্ধা জানানোর অধিকার এবং তাঁদের নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মানটুকু থাকা প্রয়োজন।
আমরা যদি সত্যিই একটি পরিণত, গণতান্ত্রিক ও বিভাজনমুক্ত বাংলাদেশ চাই, তাহলে আমাদের প্রথমেই প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
‘জুলাই’ কেন অনিবার্য হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর যেমন খুঁজতে হবে, তেমনি ‘জুলাইয়ের স্বপ্ন’ কোথায় ব্যর্থ হলো, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। আওয়ামী লীগকে যেমন অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে, বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলকেও একইভাবে আত্মসমালোচনা করতে হবে।
কারণ ইতিহাস কাউকে চিরস্থায়ী ছাড় দেয় না।
ক্ষমতার অন্ধত্ব যেমন একটি পতন ডেকে আনতে পারে, তেমনি নতুন ক্ষমতার অন্ধত্বও ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
তাই আসুন, আমরা ইতিহাসকে দলীয় বিভাজনের অস্ত্র না বানিয়ে শিক্ষা নেওয়ার উপাদান হিসেবে দেখি।
রাজনীতি থাকুক মতের, প্রতিযোগিতা থাকুক নীতির। কিন্তু মানুষের প্রতি সম্মান, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা থাকুক সবার ওপরে।
বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের সবার। এই দেশও আমাদের সবার।
আজ ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে ১৫ আগস্ট নিহত সকলের জন্য দোয়া করি। আর প্রত্যাশা করি, ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতেও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও দোয়া করার মতো একটি সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলবেন।
আমরা কি পারি না, সম্মানের জায়গায় ঐক্যবদ্ধ হতে?
আমরা কি পারি না, মতের ভিন্নতা রেখেও একে অন্যকে সম্মান করতে?
আমরা কি পারি না, প্রতিহিংসার রাজনীতি পেছনে ফেলে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির পথে হাঁটতে?
এই চাওয়াটুকুই কি খুব বেশি?