উল্টো পিরামিড পদ্ধতি কী? সাংবাদিকতায় এর গুরুত্ব

উল্টো পিরামিড পদ্ধতি কী? সাংবাদিকতায় এর গুরুত্ব

শেয়ার করে পাশে থাকুন।

একজন সাংবাদিক যখন একটি নিউজ লেখেন, তখন তার হাতে অনেক তথ্য থাকে। কিন্তু সেই তথ্যগুলো সব সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো তথ্য পাঠকের জন্য খুব জরুরি, আবার কোনো তথ্য শুধু ঘটনার পটভূমি বোঝানোর জন্য প্রয়োজন।

তাহলে কোন তথ্য আগে লিখবেন?

সাংবাদিকতায় এর একটি প্রচলিত উত্তর হলো – উল্টো পিরামিড পদ্ধতি।

উল্টো পিরামিড পদ্ধতি কী?

উল্টো পিরামিড হলো নিউজ লেখার এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শুরুতে দেওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচের দিকে চলে যায়।

সহজ করে বললে:

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

গুরুত্বপূর্ণ বিস্তারিত তথ্য

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রেক্ষাপট

তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

এই কারণেই এটিকে উল্টো পিরামিড বলা হয়।

শুরুতেই মূল খবর কেন?

ধরুন, একটি সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন মারা গেছেন।

আপনি যদি নিউজ শুরু করেন দুর্ঘটনাস্থলের ইতিহাস, রাস্তার পুরোনো সমস্যার কথা কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে, তাহলে পাঠক মূল ঘটনাটি জানতে অনেক নিচে চলে যাবেন।

বরং শুরুতেই যদি লেখা হয়:

“সাভারে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন।”

তাহলে পাঠক প্রথম লাইনেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জেনে গেলেন।

এরপর আসতে পারে দুর্ঘটনার সময়, স্থান, কীভাবে ঘটেছে, পুলিশ কী বলছে, আহতদের অবস্থা এবং অন্যান্য তথ্য।

উল্টো পিরামিডের সবচেয়ে বড় সুবিধা

অনলাইনে সবাই পুরো নিউজ পড়েন না।

কেউ শিরোনাম পড়েন, কেউ প্রথম কয়েকটি লাইন পড়েন, আবার কেউ শুধু প্রয়োজনীয় অংশটুকু খুঁজে দেখেন।

তাই নিউজের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যদি শুরুতেই থাকে, তাহলে পাঠক কম সময়েও মূল ঘটনাটি বুঝতে পারেন।

এটি সাংবাদিকের জন্যও সুবিধাজনক। সম্পাদক চাইলে নিচের তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে নিউজ ছোট করতে পারেন, অথচ মূল তথ্য থেকে যায়।

লিডের সঙ্গে উল্টো পিরামিডের সম্পর্ক

আগের পর্বে আমরা লিড নিয়ে আলোচনা করেছি।

একটি ভালো লিড সাধারণত উল্টো পিরামিডের প্রথম ধাপ।

লিডে মূল ঘটনা তুলে ধরা হয়। তারপর ধীরে ধীরে তার বিস্তারিত দেওয়া হয়।

যেমন:

লিড:
“আশুলিয়ায় একটি কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে কয়েকজন আহত হয়েছেন।”

এরপর:

কখন আগুন লেগেছে → কীভাবে খবর পাওয়া গেছে → কতটি ইউনিট কাজ করেছে → আহতদের কোথায় নেওয়া হয়েছে → কর্তৃপক্ষ কী বলছে → ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট কী।

এভাবেই তথ্য ধীরে ধীরে নিচের দিকে যায়।

সব তথ্য সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়

একজন নতুন সাংবাদিকের জন্য এটি বোঝা খুব জরুরি।

ধরুন, একটি সংবাদ সম্মেলনে একজন কর্মকর্তা ২০টি কথা বলেছেন। এর সবগুলোই নিউজে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

সেখান থেকে আপনাকে বের করতে হবে:

কোন তথ্যটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

কোন তথ্যটি পাঠকের জানা দরকার?

কোন তথ্যটি শুধু অতিরিক্ত?

এই বাছাই করার ক্ষমতাই একজন সাংবাদিককে আরও দক্ষ করে তোলে।

একটি বাস্তব উদাহরণ

ধরা যাক, পুলিশ একটি অভিযানে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

আপনার কাছে তথ্য আছে:

  • পাঁচজন গ্রেপ্তার
  • অভিযানের স্থান
  • সময়
  • পুলিশের বক্তব্য
  • তাদের কাছ থেকে কী উদ্ধার হয়েছে
  • মামলার তথ্য
  • আগের কোনো ঘটনার প্রেক্ষাপট

এখন নিউজটি এভাবে সাজানো যেতে পারে:

প্রথমে: পাঁচজন গ্রেপ্তারের খবর।

তারপর: কোথায় এবং কখন অভিযান হয়েছে।

এরপর: কী উদ্ধার হয়েছে।

তারপর: পুলিশের বক্তব্য।

সবশেষে: মামলার আগের তথ্য বা প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট।

এটাই উল্টো পিরামিডের ব্যবহার।

নিচের তথ্য কি অপ্রয়োজনীয়?

না।

উল্টো পিরামিডের অর্থ এই নয় যে নিচের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ নয়।

এর অর্থ হলো – গুরুত্বের ক্রম অনুযায়ী তথ্য সাজানো।

কোনো পাঠক পুরো নিউজ পড়লে তিনি বিস্তারিত জানতে পারবেন। আর যিনি শুধু শুরুটা পড়বেন, তিনিও মূল ঘটনাটি জানতে পারবেন।

ব্রেকিং নিউজে এর গুরুত্ব আরও বেশি

ব্রেকিং নিউজের ক্ষেত্রে উল্টো পিরামিড বিশেষভাবে কার্যকর।

কারণ ব্রেকিং নিউজে পাঠক দ্রুত জানতে চান কী ঘটেছে।

তাই প্রথমেই মূল ঘটনা, এরপর যতটুকু নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো দিতে হবে।

নতুন তথ্য পাওয়া গেলে পরে নিউজ আপডেট করা যায়।

তবে দ্রুততার জন্য অযাচাইকৃত তথ্য যোগ করা যাবে না।

উল্টো পিরামিড মানে একঘেয়ে লেখা নয়

অনেকেই মনে করেন, এই পদ্ধতিতে লিখলে সব নিউজ একই রকম হয়ে যাবে।

আসলে তা নয়।

হার্ড নিউজে উল্টো পিরামিড খুব কার্যকর হলেও মানবিক গল্প, ফিচার বা দীর্ঘ বিশেষ প্রতিবেদনে অন্য ধরনের কাঠামোও ব্যবহার করা যায়।

অর্থাৎ সাংবাদিককে জানতে হবে কোন ধরনের প্রতিবেদনে কোন কাঠামো সবচেয়ে ভালো কাজ করবে।

একজন নতুন সাংবাদিক কীভাবে অনুশীলন করবেন?

আপনি চাইলে প্রতিদিন একটি নিউজ নিয়ে এই অনুশীলন করতে পারেন।

প্রথমে পুরো নিউজটি পড়ুন।

তারপর কাগজে বা নোটে লিখুন:

১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কী?

২. দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কী?

৩. কোন তথ্যটি বক্তব্য?

৪. কোন তথ্যটি প্রেক্ষাপট?

৫. কোন তথ্য বাদ দিলেও মূল নিউজের ক্ষতি হবে না?

এভাবে কয়েক সপ্তাহ অনুশীলন করলেই তথ্যের গুরুত্ব বুঝে সাজানোর দক্ষতা অনেকটা তৈরি হয়ে যাবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় – সত্যতা

উল্টো পিরামিডের কাঠামো জানলেই ভালো সাংবাদিক হওয়া যায় না।

তথ্য যদি ভুল হয়, তাহলে সুন্দর কাঠামোও কোনো কাজে আসবে না।

প্রথমে তথ্য যাচাই করতে হবে, তারপর গুরুত্ব অনুযায়ী সাজাতে হবে।

সঠিক তথ্য + সঠিক অগ্রাধিকার + পরিষ্কার উপস্থাপন = ভালো নিউজ।

শেষ কথা

উল্টো পিরামিড পদ্ধতি সাংবাদিকতার খুব পরিচিত এবং কার্যকর একটি নিউজ লেখার কৌশল।

এর মূল কথা খুব সহজ:

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা আগে বলুন।

তারপর প্রয়োজনীয় বিস্তারিত দিন। এরপর বক্তব্য, প্রেক্ষাপট এবং তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রাখুন।

মনে রাখবেন, পাঠকের সময়ের মূল্য আছে। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব হলো সেই সময়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় তথ্যটি সবচেয়ে আগে পৌঁছে দেওয়া।

পরবর্তী পর্ব: তথ্য সংগ্রহ কীভাবে শুরু করবেন? একজন রিপোর্টারের প্রস্তুতি।

শেয়ার করে পাশে থাকুন।
Latest Articles
error: এই প্রতিবেদনটি আমাদের সাংবাদিকদের অনুসন্ধান, পরিশ্রম ও সময়ের ফল !! অনুমতি ছাড়া কপি, পুনঃপ্রকাশ বা নিজের নামে ব্যবহার করা অনৈতিক ও আইনবিরোধী। সাংবাদিকতার প্রতি সম্মান রাখুন, মূল উৎসকে স্বীকৃতি দিন।