একজন সাংবাদিকের হাতে তথ্য আসার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো – তথ্যটি সত্য কি না, তা যাচাই করা।
কারও কাছ থেকে একটি তথ্য পেলেন, একটি ভিডিও দেখলেন কিংবা ফেসবুকে একটি পোস্ট চোখে পড়ল – এসবই হতে পারে রিপোর্টিংয়ের শুরু। কিন্তু এগুলোকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা যাবে না।
সাংবাদিকের কাজ হলো তথ্যের পেছনে গিয়ে দেখা – আসলেই কী ঘটেছে?
একটি তথ্য পেলেই বিশ্বাস করবেন না
ধরুন, কেউ আপনাকে ফোন করে বললেন, একটি এলাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আপনি যদি শুধু তার কথা বিশ্বাস করে নিউজ প্রকাশ করেন, তাহলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
হতে পারে ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তিনি যে সংখ্যা বলেছেন সেটি ভুল।
হতে পারে ঘটনাটি অন্য জায়গায় ঘটেছে।
আবার এমনও হতে পারে, পুরোনো কোনো ঘটনার তথ্য নতুন ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে।
তাই তথ্য পাওয়ার পর প্রথম কাজ হলো – যাচাই করা।
প্রথমে দেখুন তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে
যিনি তথ্যটি দিয়েছেন, তিনি ঘটনাটি নিজে দেখেছেন কি না – সেটা জানতে পারেন।
যদি তিনি অন্য কারও কাছ থেকে শুনে থাকেন, তাহলে সেই ব্যক্তির পরিচয় এবং তথ্যের উৎস জানার চেষ্টা করুন।
একটি তথ্য যত বেশি হাত ঘুরে আসে, ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়তে পারে।
তাই সম্ভব হলে মূল উৎসে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
একাধিক সূত্র থেকে মিলিয়ে দেখুন
গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য হলে অন্তত আরও একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করুন।
ধরুন, আপনি জানতে পারলেন একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একজন ব্যক্তি বিষয়টি জানালেন। এখন পুলিশের কাছ থেকে তথ্যটি নিশ্চিত করতে পারেন। প্রয়োজন হলে মামলার নথিও দেখতে পারেন।
তিনটি জায়গা থেকে পাওয়া তথ্য যদি একই দিকে যায়, তাহলে আপনার রিপোর্ট অনেক বেশি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
তবে শুধু তিনজন একই কথা বললেই তথ্য সত্য হয়ে যায় না। তাদের সবাই যদি একই ভুল উৎস থেকে তথ্য নিয়ে থাকেন, তাহলে ভুল তথ্যই ছড়াতে পারে।
নথি থাকলে নথি দেখুন
কোনো তথ্যের সঙ্গে যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নথি থাকে, সেটি দেখার চেষ্টা করুন।
যেমন:
- মামলা হলে এজাহার
- আদালতের বিষয় হলে আদালতের নথি
- সরকারি সিদ্ধান্ত হলে প্রজ্ঞাপন বা অফিসিয়াল নথি
- আর্থিক তথ্য হলে সংশ্লিষ্ট রিপোর্ট
- কোনো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হলে তাদের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি
তবে নথি দেখলেই কাজ শেষ নয়।
নথিটি আসল কি না, কখন তৈরি হয়েছে এবং সেখানে আসলে কী বলা হয়েছে – সেগুলোও বুঝতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য কীভাবে যাচাই করবেন?
ফেসবুক বা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি, ভিডিও বা পোস্ট ভাইরাল হলে সেটি দেখে সরাসরি নিউজ করা খুব ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রথমে দেখুন:
ছবিটি কবে তোলা?
কোথায় তোলা?
কে প্রথম প্রকাশ করেছে?
ঘটনাটি সত্যিই সাম্প্রতিক কি না?
অনেক সময় কয়েক বছর আগের ছবি নতুন কোনো ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
একইভাবে পুরোনো ভিডিওও নতুন ঘটনা হিসেবে ভাইরাল হতে পারে।
তাই শুধু পোস্টের ক্যাপশন দেখে বিশ্বাস করা যাবে না।
ছবি ও ভিডিও যাচাই করুন
একটি ছবি কোনো ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে পারে, আবার ভুলভাবেও ব্যবহার করা হতে পারে।
ছবিতে থাকা সাইনবোর্ড, গাড়ির নম্বর, দোকানের নাম, ভবন, রাস্তা বা অন্য কোনো দৃশ্য দেখে জায়গাটি শনাক্ত করার চেষ্টা করা যায়।
ভিডিও হলে সেটি কোথা থেকে এসেছে, ভিডিওর ভেতরের দৃশ্যের সঙ্গে দাবি করা ঘটনার মিল আছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
প্রয়োজনে ঘটনাস্থলের মানুষের সঙ্গে কথা বলুন।
সময় মিলিয়ে দেখুন
তথ্য যাচাইয়ের সময় সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ধরুন, বলা হলো আজ সকালে একটি ঘটনা ঘটেছে।
কিন্তু আপনি যে ছবি পেলেন, সেটির উৎস খুঁজে দেখলেন সেটি এক বছর আগের।
তাহলে বিষয়টি পরিষ্কার – ছবিটি ওই ঘটনার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
তাই ঘটনা, ছবি, ভিডিও, বক্তব্য এবং নথির সময় মিলিয়ে দেখা দরকার।
নাম ও পদবি যাচাই করুন
সাংবাদিকতার একটি ছোট ভুলও অনেক বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কোনো কর্মকর্তার নাম, পদবি বা প্রতিষ্ঠানের নাম লেখার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন।
একজনের বক্তব্য অন্য ব্যক্তির নামে চলে গেলে সেটি শুধু বানান ভুল নয়, সাংবাদিকতার গুরুতর ভুল।
একইভাবে জায়গার নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম এবং সংখ্যাও যাচাই করা দরকার।
অভিযোগের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকুন
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে – এই তথ্য আর অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে – এই দুটি এক বিষয় নয়।
ধরুন, একজন ব্যক্তি কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ করলেন।
আপনি লিখবেন:
“দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন অমুক।”
কিন্তু সরাসরি লিখে দেওয়া যাবে না:
“অমুক দুর্নীতি করেছেন।”
যদি সেটি প্রমাণিত না হয়ে থাকে।
অভিযোগকারী কী বলেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য কী এবং সংশ্লিষ্ট নথিতে কী আছে – সবকিছু দেখে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।
সূত্র গোপন থাকলেও তথ্য যাচাই করতে হবে
কখনো কোনো সূত্র পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দিতে পারেন।
এ ধরনের তথ্য সাংবাদিকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
কিন্তু সূত্রের পরিচয় গোপন রাখার অর্থ এই নয় যে তার দেওয়া তথ্য যাচাই করার প্রয়োজন নেই।
বরং পরিচয় প্রকাশ করা না গেলে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব আরও বেশি।
সম্ভব হলে অন্য স্বাধীন সূত্র, নথি বা প্রমাণ দিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
নিজের ধারণাকে তথ্য বানাবেন না
ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিক অনেক কিছু নিজের চোখে দেখতে পারেন।
কিন্তু যা দেখেছেন, তার অর্থ নিজের মতো করে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ধরুন, আপনি দেখলেন একটি গাড়ি রাস্তার পাশে পড়ে আছে।
এ থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না যে গাড়িটি কীভাবে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে।
কারণটি জানতে পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী বা সংশ্লিষ্ট অন্য সূত্রের বক্তব্য প্রয়োজন হতে পারে।
যা দেখেছেন, সেটি লিখুন। যা জানেন না, সেটি অনুমান করে লিখবেন না।
যাচাই করার সময় নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন
কোনো তথ্য প্রকাশের আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন:
কে তথ্যটি দিয়েছে?
সে কীভাবে জানে?
অন্য কোনো সূত্রে কি একই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে?
কোনো নথি বা প্রমাণ আছে কি?
সময় ও স্থান ঠিক আছে কি?
কোনো পক্ষের বক্তব্য বাদ পড়েছে কি?
তথ্যের কোনো অংশ এখনও নিশ্চিত নয় কি?
এই প্রশ্নগুলো অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে রিপোর্টিংয়ের ভুল অনেক কমে আসবে।
দ্রুত প্রকাশের চেয়ে সঠিক প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ
অনলাইন সাংবাদিকতায় আগে নিউজ দেওয়ার একটা চাপ থাকে।
কিন্তু কয়েক মিনিট আগে নিউজ দেওয়ার জন্য যদি ভুল তথ্য প্রকাশ করা হয়, তাহলে সেই কয়েক মিনিটের সুবিধার চেয়ে ক্ষতিটাই বড় হতে পারে।
একজন সাংবাদিকের লক্ষ্য হওয়া উচিত:
সবার আগে নয়, সবার আগে সঠিক তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করা।
ভুল হলে কী করবেন?
সব যাচাই করার পরও কখনো ভুল হতে পারে।
ভুল বুঝতে পারলে সেটি লুকানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
দ্রুত সংশোধন করুন।
প্রয়োজনে পাঠককে জানিয়ে দিন যে আগের তথ্যটি সংশোধন করা হয়েছে।
ভুল স্বীকার করা সাংবাদিকের দুর্বলতা নয়। বরং ভুল বুঝতে পেরে সেটি ঠিক করার সাহস পেশাদারিত্বের পরিচয়।
শেষ কথা
তথ্য সংগ্রহ একজন সাংবাদিকের কাজের শুরু। কিন্তু তথ্য যাচাই না করা পর্যন্ত সেই তথ্য একটি দায়িত্বশীল সংবাদের ভিত্তি হয়ে ওঠে না।
একজন ভালো সাংবাদিক তাই শুধু প্রশ্ন করেন না, প্রশ্নের উত্তরও যাচাই করেন।
মনে রাখবেন:
একটি তথ্য সত্য কি না – সেটা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো তথ্যের উৎসের কাছে যাওয়া, একাধিক জায়গা থেকে মিলিয়ে দেখা এবং প্রয়োজন হলে প্রমাণ খোঁজা।
কারণ পাঠক আপনার কাছে শুধু খবর পড়তে আসেন না – তারা আপনার দেওয়া তথ্যকে বিশ্বাস করতেও আসেন।
আর সেই বিশ্বাস ধরে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো – যাচাই ছাড়া কিছু প্রকাশ না করা।
পরবর্তী পর্ব: সাক্ষাৎকার কীভাবে নেবেন? একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন করার কৌশল।