সাংবাদিকতার কাজ করতে গেলে একসময় আপনাকে মানুষের সামনে বসতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে এবং তার কাছ থেকে তথ্য বের করে আনতে হবে।
কিন্তু সাক্ষাৎকার মানে শুধু প্রশ্ন করা নয়।
একজন ভালো সাংবাদিক জানেন কখন প্রশ্ন করতে হবে, কী প্রশ্ন করতে হবে, কখন চুপ করে শুনতে হবে এবং কোন উত্তরের ভেতর থেকে পরের প্রশ্নটি বের করে আনতে হবে।
অনেক সময় একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি আসে তার করা প্রথম প্রশ্ন থেকে নয়, বরং দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রশ্ন থেকে।
সাক্ষাৎকারের আগে প্রস্তুতি নিন
সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগে যার সঙ্গে কথা বলবেন, তার সম্পর্কে যতটুকু প্রয়োজন জেনে নিন।
তিনি কী করেন, কোন ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্ক, তার আগের বক্তব্য কী ছিল – এসব জানা থাকলে প্রশ্ন করা অনেক সহজ হয়।
ধরুন, আপনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
আপনি যদি শুধু বলেন, “স্যার, ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলুন”, তাহলে হয়তো তিনি সাধারণ একটি বক্তব্য দেবেন।
কিন্তু আপনি যদি ঘটনাটি সম্পর্কে আগে থেকেই কিছু জানেন, তাহলে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করতে পারবেন।
যেমন:
“অভিযানে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?”
“তাদের কাছ থেকে কী উদ্ধার হয়েছে?”
“মামলার তদন্ত এখন কোন পর্যায়ে?”
এ ধরনের প্রশ্ন থেকে অনেক বেশি নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়।
প্রশ্ন করার আগে ঠিক করুন, আপনি কী জানতে চান
সাক্ষাৎকারে যাওয়ার আগে কয়েকটি মূল প্রশ্ন লিখে রাখুন।
সব প্রশ্ন একসঙ্গে করতে হবে না। বরং এগুলোকে মাথায় রাখুন।
কারণ সাক্ষাৎকার চলার সময় উত্তরদাতা এমন কোনো তথ্য দিতে পারেন, যা আপনার আগে থেকে তৈরি করা প্রশ্নের মধ্যেই ছিল না।
সেখান থেকেই নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
প্রথম প্রশ্নটি সহজ হতে পারে
সাক্ষাৎকারের শুরুতেই খুব কঠিন বা আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করলে অনেক সময় উত্তরদাতা অস্বস্তিতে পড়ে যেতে পারেন।
তাই পরিস্থিতি অনুযায়ী সহজ একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যায়।
তারপর ধীরে ধীরে মূল বিষয়ে যাওয়া যায়।
তবে এটি সব সাক্ষাৎকারের জন্য একই নিয়ম নয়। সময় ও পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
প্রশ্ন করুন, উত্তরটাও মন দিয়ে শুনুন
সাক্ষাৎকারের সময় সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলোর একটি হলো – সাংবাদিক পরের প্রশ্নটি করার জন্য এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে উত্তরদাতা কী বলছেন, সেটিই ঠিকমতো শোনেন না।
এটা করা যাবে না।
উত্তরদাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলে সেখানেই থামুন।
প্রয়োজনে বলুন:
“আপনি একটু বিস্তারিত বলবেন?”
অথবা,
“আপনি যখন বলছেন তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে, সেই তথ্যটি কী?”
এই ধরনের প্রশ্ন থেকেই অনেক সময় ভালো তথ্য বেরিয়ে আসে।
হ্যাঁ বা না প্রশ্ন সবসময় কার্যকর নয়
প্রশ্ন এমনভাবে করলে উত্তরদাতা শুধু “হ্যাঁ” বা “না” বলে শেষ করে দিতে পারেন।
যেমন:
“আপনি কি মনে করেন অভিযান সফল হয়েছে?”
এর উত্তর হতে পারে – “হ্যাঁ।”
এর পরিবর্তে জিজ্ঞেস করা যায়:
“অভিযানটিকে সফল বলছেন কেন? কী কী তথ্য বা ফলাফল পেয়েছেন?”
এখানে উত্তরদাতাকে বিস্তারিত বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
কঠিন প্রশ্ন করতে ভয় পাবেন না
সাংবাদিকের কাজ শুধু সুন্দর সুন্দর প্রশ্ন করা নয়।
প্রয়োজন হলে কঠিন প্রশ্নও করতে হবে।
তবে কঠিন প্রশ্ন মানেই অসভ্য বা আক্রমণাত্মক হওয়া নয়।
ধরুন, একটি ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আপনি বলতে পারেন:
“ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে ছিল বলে জানা গেছে। এরপরও ঘটনাটি কীভাবে ঘটল – এ বিষয়ে আপনার ব্যাখ্যা কী?”
এটি কঠিন প্রশ্ন, কিন্তু প্রশ্নটি করা হয়েছে তথ্যের ভিত্তিতে এবং সম্মানজনকভাবে।
একই প্রশ্ন বারবার করার প্রয়োজন নেই
উত্তরদাতা যদি একটি প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে দিয়ে থাকেন, তাহলে একই প্রশ্ন ঘুরিয়ে আবার করার দরকার নেই।
তবে তিনি যদি প্রশ্ন এড়িয়ে যান, তাহলে অন্যভাবে প্রশ্ন করতে পারেন।
যেমন:
“আপনি বললেন বিষয়টি তদন্তাধীন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তদন্তে কী পাওয়া গেছে?”
এভাবে মূল প্রশ্নের কাছাকাছি থেকে আরও নির্দিষ্ট উত্তর বের করা যায়।
উত্তরদাতার কথার মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে ধরিয়ে দিন
কখনো একজন ব্যক্তি সাক্ষাৎকারে এমন দুটি কথা বলতে পারেন, যেগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে।
সেক্ষেত্রে সাংবাদিকের উচিত বিষয়টি পরিষ্কার করা।
যেমন:
“আপনি একটু আগে বললেন ঘটনাটি সকাল ১০টায় ঘটেছে। কিন্তু আপনার দেওয়া আগের তথ্য অনুযায়ী সময়টি ছিল ৯টা। কোন তথ্যটি সঠিক?”
এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংবাদিকসুলভ প্রশ্ন।
কারণ আপনার কাজ শুধু বক্তব্য রেকর্ড করা নয়, বক্তব্যের সত্যতা ও সামঞ্জস্যও যাচাই করা।
নিজের মতামত চাপিয়ে দেবেন না
সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের প্রয়োজন নেই।
আপনার কাজ হলো প্রশ্ন করা এবং উত্তর পাওয়া।
বিশেষ করে রাজনৈতিক, অপরাধ, বিতর্ক বা অভিযোগের ঘটনায় নিজের পক্ষপাত যেন প্রশ্নের মধ্যে চলে না আসে।
প্রশ্ন হবে তথ্যভিত্তিক।
অভিযোগের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের কথা শুনুন
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে সাক্ষাৎকার হলে শুধু অভিযোগকারীর বক্তব্য নিয়ে চলে যাবেন না।
অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যও নেওয়ার চেষ্টা করুন।
এতে প্রতিবেদনে ভারসাম্য আসে।
কেউ বক্তব্য দিতে না চাইলে সেটিও সংবাদে প্রয়োজন অনুযায়ী উল্লেখ করা যায়।
সব কথা হুবহু নিউজে দিতে হবে না
সাক্ষাৎকারে একজন ব্যক্তি অনেক কথা বলতে পারেন।
তার সব কথা নিউজে ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।
আপনার কাজ হলো সাক্ষাৎকার থেকে সংবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বের করে আনা।
কোন বক্তব্য খবরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি শুধু ব্যক্তিগত মন্তব্য – এই পার্থক্য বুঝতে হবে।
রেকর্ড রাখুন
গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার হলে সম্ভব হলে অডিও রেকর্ড রাখুন, তবে পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি বিবেচনা করুন।
সঙ্গে নোটও নিন।
কারণ পরে নিউজ লেখার সময় একটি শব্দ বা বক্তব্য ভুলভাবে মনে পড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে নাম, সংখ্যা, তারিখ ও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য নোট করে রাখা ভালো।
সাক্ষাৎকারের শেষে একটি সুযোগ রাখুন
সাক্ষাৎকার শেষ করার আগে একটি সহজ প্রশ্ন করতে পারেন:
“এই বিষয়ে আর কিছু যোগ করতে চান?”
অনেক সময় উত্তরদাতা তখন এমন একটি তথ্য দেন, যা আগের প্রশ্নগুলোতে আসেনি।
এই শেষ প্রশ্নটি তাই কখনো কখনো বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একজন ভালো সাক্ষাৎকারগ্রহীতা বেশি কথা বলেন না
সাক্ষাৎকারে সাংবাদিকের কাজ বক্তৃতা দেওয়া নয়।
আপনি প্রশ্ন করবেন, তারপর শুনবেন।
অনেক সময় একজন সাংবাদিক যদি নিজেই বেশি কথা বলতে থাকেন, তাহলে উত্তরদাতার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করার সুযোগ কমে যায়।
ভালো প্রশ্ন করা যেমন দক্ষতা, তেমনি ভালোভাবে শুনতেও জানতে হয়।
শেষ কথা
সাক্ষাৎকার সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।
একজন ভালো সাংবাদিক শুধু প্রশ্নের তালিকা নিয়ে বসেন না। তিনি উত্তর শোনেন, উত্তর থেকে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেন এবং প্রয়োজন হলে কথার অসঙ্গতিও ধরিয়ে দেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – সাক্ষাৎকার নেওয়ার উদ্দেশ্য কাউকে হারানো নয়, সত্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য বের করে আনা।
মনে রাখবেন:
ভালো সাক্ষাৎকার মানে বেশি প্রশ্ন নয় – সঠিক প্রশ্ন, মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনীয় জায়গায় আবার প্রশ্ন করা।
একজন সাংবাদিকের একটি ভালো প্রশ্ন কখনো কখনো এমন তথ্য বের করে আনতে পারে, যা পুরো নিউজের দিকটাই বদলে দিতে পারে।
পরবর্তী পর্ব: প্রশ্ন করার ধরন – ওপেন-এন্ডেড ও ক্লোজড প্রশ্নের পার্থক্য।