সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় শুধু প্রশ্ন করলেই হবে না। কেমন প্রশ্ন করছেন, সেটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
একজন সাংবাদিকের প্রশ্ন এমন হওয়া দরকার, যাতে উত্তরদাতার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য বেরিয়ে আসে। কখনো বিস্তারিত উত্তর দরকার হয়, আবার কখনো শুধু একটি নির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করাই যথেষ্ট।
এই জায়গাতেই কাজে আসে ওপেন-এন্ডেড এবং ক্লোজড প্রশ্ন।
ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন কী?
যে প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়া যায় না এবং উত্তরদাতাকে বিস্তারিত বলার সুযোগ দেয়, সেটিই ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন।
যেমন:
“ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে?”
“আপনি সেখানে কী দেখেছেন?”
“এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?”
“আপনার কাছে ঘটনাটির কোন দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে?”
এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে একজন ব্যক্তি নিজের ভাষায় বিস্তারিত বলতে পারেন।
সাংবাদিকের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি উত্তর থেকেই পরবর্তী অনেক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
ক্লোজড প্রশ্ন কী?
ক্লোজড প্রশ্ন সাধারণত এমন প্রশ্ন, যার উত্তর সীমিত।
যেমন:
“ঘটনাটি কি সকালে ঘটেছে?”
উত্তর হতে পারে – “হ্যাঁ।”
অথবা,
“আপনি কি ঘটনাস্থলে ছিলেন?”
উত্তর – “না।”
আবার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করতেও ক্লোজড প্রশ্ন কাজে লাগে।
যেমন:
“ঘটনাটি কি ১০ আগস্ট ঘটেছে?”
“আপনি কি তখন থানার দায়িত্বে ছিলেন?”
এখানে সাংবাদিকের লক্ষ্য বিস্তারিত বক্তব্য নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করা।
তাহলে কোন প্রশ্ন বেশি ভালো?
এখানে আসলে কোনোটিই একা বেশি ভালো নয়।
দুটোরই আলাদা ব্যবহার আছে।
সাক্ষাৎকারের শুরুতে বা কোনো বিষয় বিস্তারিত জানতে চাইলে ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন বেশি কার্যকর।
আর কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করতে ক্লোজড প্রশ্ন খুব কাজে দেয়।
একজন ভালো সাংবাদিক পরিস্থিতি অনুযায়ী দুটোই ব্যবহার করেন।
একটি উদাহরণ দেখি
ধরুন, আপনি একটি সড়ক দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন:
“দুর্ঘটনাটি কি দুপুরে ঘটেছে?”
তিনি হয়তো বলবেন:
“হ্যাঁ।”
এখানেই উত্তর শেষ।
কিন্তু আপনি যদি প্রশ্ন করেন:
“দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল?”
তাহলে তিনি হয়তো বলবেন, কোন গাড়ি কোথা থেকে আসছিল, কীভাবে সংঘর্ষ হলো এবং এরপর কী ঘটেছিল।
এখান থেকে আপনি আরও প্রশ্ন করতে পারবেন।
ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যায়
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলার সময় প্রথমেই অনেক ছোট ছোট প্রশ্ন না করে একটি বড় প্রশ্ন করা যেতে পারে।
যেমন:
“আপনি নিজের চোখে পুরো ঘটনাটি কীভাবে দেখেছেন, একটু বিস্তারিত বলবেন?”
তারপর তার উত্তরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো ধরে ধরে প্রশ্ন করুন।
এতে সাক্ষাৎকার অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়।
এরপর ক্লোজড প্রশ্ন দিয়ে তথ্য নিশ্চিত করুন
ধরুন, প্রত্যক্ষদর্শী বললেন:
“দুর্ঘটনাটি বিকেল ৪টার দিকে ঘটেছে।”
এখন আপনি নির্দিষ্ট করে জানতে পারেন:
“সময়টা কি ঠিক ৪টা ছিল, নাকি আনুমানিক?”
অথবা:
“আপনি কি ঘটনাটি রাস্তার পাশ থেকে দেখেছেন?”
এভাবে ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন থেকে পাওয়া তথ্যকে ক্লোজড প্রশ্নের মাধ্যমে আরও নির্দিষ্ট করা যায়।
প্রশ্নের মধ্যে উত্তর ঢুকিয়ে দেবেন না
সাংবাদিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো – প্রশ্নের মধ্যেই নিজের ধারণা চাপিয়ে না দেওয়া।
যেমন:
“পুলিশের গাফিলতির কারণেই কি দুর্ঘটনাটি ঘটেছে?”
এই প্রশ্নের মধ্যে আপনি ধরে নিচ্ছেন যে পুলিশের গাফিলতি ছিল।
এর পরিবর্তে বলা যায়:
“দুর্ঘটনার পেছনে কী কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?”
এতে উত্তরদাতা নিজের মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ খুব গুরুত্বপূর্ণ
সাংবাদিকতার সাক্ষাৎকারে কেন এবং কীভাবে দিয়ে করা প্রশ্ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
“কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?”
“কীভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে?”
“কেন আপনি এই অভিযোগ করছেন?”
“ঘটনাটি কীভাবে আপনার সামনে ঘটেছে?”
এসব প্রশ্নের মাধ্যমে শুধু ঘটনা নয়, ঘটনার পেছনের কারণও জানা যায়।
তবে সব প্রশ্ন দীর্ঘ হতে হবে এমন নয়
অনেক সময় সাংবাদিকরা মনে করেন ভালো প্রশ্ন মানেই বড় প্রশ্ন।
আসলে তা নয়।
প্রশ্ন যত পরিষ্কার হবে, উত্তর পাওয়াও তত সহজ হবে।
একটি ছোট প্রশ্ন অনেক বড় তথ্য বের করে আনতে পারে।
যেমন:
“তারপর কী হলো?”
এই একটি প্রশ্নের উত্তর থেকেই হয়তো সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
উত্তরদাতা প্রশ্ন এড়িয়ে গেলে কী করবেন?
কখনো কখনো একজন উত্তরদাতা সরাসরি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে অন্য বিষয়ে চলে যেতে পারেন।
তখন শান্তভাবে আবার মূল প্রশ্নে ফিরে আসুন।
যেমন:
“আপনি অন্য বিষয়টি বলেছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি জানতে চাইছিলাম, ঘটনার সময় আপনারা ঠিক কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?”
এভাবে প্রশ্ন করলে কথোপকথনও স্বাভাবিক থাকে এবং মূল তথ্যটিও পাওয়া যায়।
একই প্রশ্ন অন্যভাবে করা যায়
কেউ একটি প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে না দিলে একই প্রশ্ন হুবহু আবার করার প্রয়োজন নেই।
অন্যভাবে প্রশ্ন করুন।
যেমন:
“আপনি বলছেন বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে এখন পর্যন্ত কী পাওয়া গেছে?”
অথবা:
“এই তদন্ত শেষ হতে কত সময় লাগতে পারে?”
একটি উত্তর থেকে পরবর্তী প্রশ্ন তৈরি করাই একজন সাংবাদিকের বড় দক্ষতা।
প্রশ্নের সময় সাংবাদিকের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্ন করার সময় রাগ, হাসি, বিরক্তি বা ব্যক্তিগত পক্ষপাত যেন প্রকাশ না পায়।
বিশেষ করে কঠিন প্রশ্নের ক্ষেত্রেও শান্ত থাকতে হবে।
উত্তরদাতা যদি উত্তেজিত হয়ে যান, সাংবাদিকের কাজ উত্তেজনা বাড়ানো নয়।
বরং প্রশ্ন পরিষ্কার করে আবার জানতে হবে।
সাক্ষাৎকার মানে জেরা করা নয়
এটি মনে রাখা খুব জরুরি।
সাংবাদিকের কাজ কাউকে পরাজিত করা নয়।
আবার শুধু ভালো সম্পর্ক রাখার জন্য কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও সাংবাদিকতার কাজ নয়।
লক্ষ্য একটাই – সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য বের করে আনা।
তাই প্রশ্ন হবে দৃঢ়, কিন্তু ভদ্র।
শেষ কথা
একজন দক্ষ সাংবাদিক জানেন কখন বিস্তারিত উত্তর বের করতে ওপেন-এন্ডেড প্রশ্ন করতে হবে এবং কখন নির্দিষ্ট তথ্য নিশ্চিত করতে ক্লোজড প্রশ্ন করতে হবে।
দুটো প্রশ্নের সঠিক ব্যবহার সাক্ষাৎকারকে অনেক বেশি কার্যকর করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো – প্রশ্ন করার পর উত্তরটি মন দিয়ে শুনুন।
কারণ অনেক সময় আপনার পরবর্তী প্রশ্নটি আগে থেকে প্রস্তুত থাকে না। উত্তরদাতার একটি কথাই আপনাকে সেই প্রশ্নটি তৈরি করে দেয়।
মনে রাখবেন:
ভালো সাক্ষাৎকারের শক্তি শুধু ভালো প্রশ্নে নয়, ভালোভাবে শোনার মধ্যেও।
একজন সাংবাদিক যত মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, তত বেশি ভালো প্রশ্ন করতে পারবেন – আর তত বেশি তথ্য বের করে আনতে পারবেন।
পরবর্তী পর্ব: সংবাদ লেখার শুরু – একটি ভালো লিড কী এবং কেন লিড গুরুত্বপূর্ণ।