একটি নিউজের শিরোনাম পাঠককে খবরের দিকে নিয়ে আসে। এরপর লিড তাকে মূল ঘটনা বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু নিউজ যদি একটু বড় হয়, তখন শুধু শিরোনাম আর লিড দিয়ে পুরো লেখাটাকে সাজিয়ে রাখা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়।
এখানেই সাবহেডিং বা উপশিরোনামের প্রয়োজন হয়।
সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সাবহেডিং একটি বড় নিউজকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে দেয়। পাঠকও সহজে বুঝতে পারেন, কোন অংশে কী তথ্য রয়েছে।
সাবহেডিং কী?
সহজভাবে বললে, একটি বড় প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশের আগে যে ছোট শিরোনাম দেওয়া হয়, সেটিই সাবহেডিং।
ধরুন, আপনি একটি দীর্ঘ প্রতিবেদনে একটি ঘটনার কারণ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, পুলিশের বক্তব্য এবং সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরছেন।
সবকিছু একসঙ্গে লিখলে লেখাটি একঘেয়ে হয়ে যেতে পারে।
এর পরিবর্তে আপনি লিখতে পারেন:
ঘটনার শুরু যেভাবে
প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন
পুলিশের বক্তব্য
সর্বশেষ পরিস্থিতি
এগুলোই সাবহেডিং।
সাবহেডিং কেন দরকার?
একটি বড় নিউজের পুরোটা একসঙ্গে পড়া অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে।
সাবহেডিং থাকলে পাঠক দ্রুত বুঝতে পারেন কোথায় কী তথ্য রয়েছে। কেউ যদি শুধু পুলিশের বক্তব্য জানতে চান, তিনি সেই অংশটি সহজেই খুঁজে নিতে পারবেন।
বিশেষ করে অনলাইন নিউজে এর গুরুত্ব আরও বেশি। মোবাইল ফোনে পাঠক সাধারণত ছোট ছোট অংশে নিউজ পড়েন। তাই লেখাকে একটু ভেঙে উপস্থাপন করলে পড়তে সুবিধা হয়।
সব নিউজে কি সাবহেডিং দিতে হবে?
না।
একটি ছোট নিউজে সাবহেডিং দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।
যেমন, ২০০ থেকে ৩০০ শব্দের একটি ছোট দুর্ঘটনার সংবাদে শিরোনাম, লিড এবং কয়েকটি অনুচ্ছেদই যথেষ্ট হতে পারে।
কিন্তু প্রতিবেদন যদি দীর্ঘ হয় এবং একাধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকে, তখন সাবহেডিং বেশ কাজে দেয়।
অর্থাৎ সাবহেডিং ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন অনুযায়ী, নিয়ম পূরণ করার জন্য নয়।
সাবহেডিং যেন সত্যিই অর্থবহ হয়
সাবহেডিং শুধু সুন্দর দেখানোর জন্য দেওয়া উচিত নয়।
সেটি দেখে পাঠক যেন পরের অংশে কী আছে, তার একটা ধারণা পান।
যেমন:
“ঘটনার বিস্তারিত”
এটি খুব সাধারণ একটি সাবহেডিং।
এর পরিবর্তে যদি লেখা হয়:
“আগুন ছড়িয়ে পড়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই”
তাহলে পাঠকের কাছে পরের অংশ সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি হয়।
তবে সাবহেডিংয়ে এমন কোনো তথ্য দেওয়া যাবে না, যা পরের অংশের সঙ্গে মেলে না।
নিউজের অনুচ্ছেদ ছোট রাখুন
অনলাইনে বড় বড় অনুচ্ছেদ পড়তে অনেকেরই বিরক্তি লাগে।
তাই একটি অনুচ্ছেদে একটি বিষয় বা একটি নির্দিষ্ট তথ্য রাখার চেষ্টা করুন।
একটি অনুচ্ছেদে যদি একসঙ্গে পাঁচ-ছয়টি বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পাঠকের জন্য তথ্য আলাদা করা কঠিন হয়ে যায়।
ছোট অনুচ্ছেদ মানে আবার প্রতিটি বাক্য আলাদা করে দেওয়া নয়। বিষয় অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবে অনুচ্ছেদ ভাগ করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চোখে পড়ার মতো করুন
নিউজে যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা, সিদ্ধান্ত বা তথ্য থাকে, সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায় যাতে পাঠকের চোখে পড়ে।
তবে এখানে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়।
অতিরিক্ত বোল্ড, বড় অক্ষর, রঙ, ইমোজি কিংবা ডিজাইন ব্যবহার করলে নিউজের পেশাদারিত্ব নষ্ট হতে পারে।
একটি সংবাদমাধ্যমের ডিজাইন হওয়া উচিত পরিষ্কার এবং সংযত।
বক্তব্য আলাদা করে উপস্থাপন করা যায়
দীর্ঘ কোনো প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য থাকলে সেটিকে আলাদা অনুচ্ছেদে রাখা ভালো।
যেমন:
“আমরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব,” – জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
এতে পাঠকের চোখে বক্তব্যটি আলাদা করে ধরা পড়ে।
তবে বক্তব্যকে নিজের ভাষায় পরিবর্তন করে উদ্ধৃতি হিসেবে দেওয়া যাবে না। কারও বক্তব্যের অর্থ বদলে গেলে সেটি সাংবাদিকতার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ছবি ও ক্যাপশনও নিউজের অংশ
অনলাইন নিউজে শুধু লেখা নয়, ছবিও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ভালো ছবি পুরো ঘটনার সঙ্গে পাঠকের যোগাযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে ছবি ব্যবহারের সময় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা দরকার।
ছবিটি যেন সত্যিই ওই সংবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়।
পুরোনো ছবি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা উল্লেখ করতে হবে।
আর ছবির ক্যাপশনেও ভুল তথ্য দেওয়া যাবে না।
যে ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে না, সেটি ক্যাপশনে দাবি করা উচিত নয়।
অনলাইনে নিউজ সাজানোর সময়
একটি অনলাইন নিউজ সাধারণত এভাবে সাজানো যেতে পারে:
শিরোনাম
লিড
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
সাবহেডিং
বিস্তারিত তথ্য
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য
প্রয়োজনে দ্বিতীয় সাবহেডিং
প্রেক্ষাপট
সর্বশেষ অবস্থা
এভাবে সাজালে বড় প্রতিবেদনও পাঠকের কাছে তুলনামূলক সহজ মনে হয়।
বেশি ডিজাইন মানেই ভালো উপস্থাপন নয়
অনলাইন নিউজে অনেক সময় দেখা যায়, একটি প্রতিবেদনে এত বেশি রঙ, বক্স, ছবি, বড় লেখা ও নানা ধরনের গ্রাফিক্স ব্যবহার করা হয়েছে যে মূল নিউজটাই চোখে পড়ে না।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এটা এড়িয়ে চলা ভালো।
ডিজাইনের উদ্দেশ্য হলো তথ্যকে সহজে বোঝানো, তথ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়।
একটি পরিষ্কার নিউজ পেজ সাধারণত বেশি পেশাদার দেখায়।
সাবহেডিং লেখার সময় যে ভুল করবেন না
সাবহেডিং খুব লম্বা করবেন না।
পুরো একটি বাক্যকে সাবহেডিং বানানোরও প্রয়োজন নেই।
আবার এমন রহস্যময় সাবহেডিংও দেবেন না, যার সঙ্গে পরের অংশের কোনো পরিষ্কার সম্পর্ক নেই।
যেমন:
“এরপর যা ঘটল…”
এ ধরনের বাক্য অনেক সময় কৌতূহল তৈরি করলেও সাংবাদিকতার প্রতিবেদনে সব জায়গায় মানানসই নয়।
তার চেয়ে সরাসরি বিষয়টি বলা ভালো।
শেষ কথা
নিউজের উপস্থাপন শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এটি পাঠকের বোঝার সুবিধার সঙ্গেও জড়িত।
একটি বড় নিউজকে প্রয়োজন অনুযায়ী সাবহেডিং, ছোট অনুচ্ছেদ, সঠিক ছবি, পরিষ্কার ক্যাপশন এবং পরিমিত ডিজাইনের মাধ্যমে সাজানো যায়।
তবে সবকিছুর মূল উদ্দেশ্য একটাই:
পাঠক যেন কম পরিশ্রমে সঠিক তথ্য বুঝতে পারেন।
মনে রাখবেন, ভালো সাংবাদিকতা শুধু ভালো তথ্য সংগ্রহ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সেই তথ্য কীভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করবেন, সেটিও সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরবর্তী পর্ব: উল্টো পিরামিড পদ্ধতি কী? সাংবাদিকতায় এর গুরুত্ব।